মা নাহিদা খুঁজছেন তিন প্রশ্নের উত্তর
কুমিল্লায় শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের ১০ দিন আগে তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের প্রতিষ্ঠানে বিনা বেতনে চাকরি নেয় চার আসামির একজন মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ (১৬)। এ ঘটনার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্কে আছে কি না? কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) সহকারী প্রক্টর থাকাকালে কিশোর গ্যাংয়ের কয়েক সদস্যকে পুলিশে সোপর্দ করেছিলেন অপ্রতিমের মা সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম। সেই গ্যাংয়ের নেতৃত্বে ছিল আরেক আসামি সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯)। অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এ ঘটনার কোনো যোগসূত্র আছে কি না? এমন তিন প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন অপ্রতিমের মা। গতকাল সকালে কুবির গোলচত্বরে কুবি শিক্ষক সমিতির উদ্যোগে আয়োজিত মানববন্ধনে অপ্রতিমের মায়ের পক্ষে এসব তথ্য তুলে ধরেন তাঁর সহকর্মী বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. কামরুন নাহার।
মানববন্ধনে ড. কামরুন নাহারের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, অপ্রতিম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার ফাহাদ ঘটনার প্রায় ১০ দিন আগে অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে বিনা বেতনে চাকরি নেয়। এ ছাড়া সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর থাকাকালে মাদকবিরোধী অভিযানে কুমিল্লার স্থানীয় কিশোর গ্যাংয়ের কয়েক সদস্যকে পুলিশে সোপর্দ করেছিলেন বলে জানানো হয়। ওই কিশোর গ্যাংয়ের নেতৃত্বে ছিল মামলার আরেক আসামি তুহিন বলেও দাবি করা হয়েছে। অপ্রতিমের মা মনে করেন, ওই ঘটনার সঙ্গে তাঁর ছেলে হত্যার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এ বিষয়টি তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তিনি। অপ্রতিমের মায়ের তৃতীয় প্রশ্ন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে তিনজনকে অপ্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে দেখানো হয়েছে। তারা প্রকৃতপক্ষে অপ্রাপ্তবয়স্ক কি না, তা ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি। এ ছাড়া অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে আইন সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন অপ্রতিমের মা।
ড. কামরুন নাহার সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আমি অপ্রতিমের মায়ের সঙ্গে দেখা করেছি। তাঁর অবস্থা খুবই খারাপ। তার পরও তিনি আমাকে কয়েকটা দাবি জানাতে বলেছেন; তাঁর পক্ষ হয়ে আমি এসব দাবি জানিয়েছি।’ কুবি শিক্ষক সমিতির সদস্যসচিব অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জুলহাস উদ্দিনের সঞ্চালনায় মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন সরকার, শিক্ষক সমিতির আহ্বায়ক শামীমা নাসরিন, ইউট্যাব, কুবি ইউনিটের (ভারপ্রাপ্ত) সভাপতি অধ্যাপক ড. শাহাদাৎ হোসেনসহ বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভাগীয় প্রধান ও হলের প্রভোস্টরা।
ফোনকলের সূত্র ধরে খোলে হত্যারহস্যের জট : আইফোন নেওয়ার পাশাপাশি ৫ হাজার টাকা ধার নিয়ে বিরোধও হত্যাকাণ্ডের কারণ হতে পারে বলে জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা। তাঁদের তথ্যানুযায়ী, শনিবার সকাল ৯টার দিকে তুহিনকে হেফাজতে নেওয়া হয়। তখন পুলিশ জানত না যে অপ্রতিম মারা গেছে। পরে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তারা অপ্রতিমের লাশ পাওয়ার খবর পায়। তদন্তকারীরা জানান, শুরুতে তুহিন হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে। পরে রাতে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে। তবে অন্যদের নাম বলতে রাজি হয়নি। এ সময় তুহিনের মোবাইল ফোনে বারবার কল আসছিল। অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে কাজ করা এক কিশোর (মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ) ওই ফোনে কল করছিল। বিষয়টি তদন্তকারীদের নজরে এলে ওই কিশোরকেও হেফাজতে নেওয়া হয়। তখন তার পরনে ছিল অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানের নাম লেখা টি-শার্ট। পরে তুহিন আরেকজনের নাম জানালে তাকেও পুলিশ হেফাজতে নেয়। জিজ্ঞাসাবাদে আইফোনের পাশাপাশি ৫ হাজার টাকা ধার নিয়ে বিরোধের তথ্যও পাওয়া যায়। অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের মোবাইল ফোনের যন্ত্রাংশ বিক্রির প্রতিষ্ঠান ইয়েসটেকে ওই কিশোর কাজ করত। অপ্রতিম তাকে ৫ হাজার টাকা ধার দিয়েছিল। সেই টাকা ফেরত চাওয়া নিয়ে তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিরোধে হত্যাকাণ্ডটি ঘটতে পারে বলে ধারণা তদন্তসংশ্লিষ্টদের। অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার সন্দেহভাজন দুই কিশোর মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ ও কামরুল হাসানকে (১৬) টঙ্গীর সংশোধনাগারে (শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র) পাঠানো হয়েছে।
বিচার দাবিতে কুবি শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ : অপ্রতিমের হত্যার প্রতিবাদ, সুষ্ঠু বিচার ও ১২ দফা বাস্তবায়নের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেছেন কুবি শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলচত্বরে অনুষ্ঠিত এ কর্মসূচিতে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য বা সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে বের করারও দাবি জানান তাঁরা।
