মুছাব্বির হত্যায় ভাড়াটে কিলার

আলী আজম
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে দুর্বৃত্তদের গুলিতে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান মুছাব্বির খুন হওয়ার ঘটনায় এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সিসি ক্যামেরায় দুর্বৃত্তদের পালিয়ে যাওয়ার ফুটেজ পাওয়া গেলেও এখনো তাদের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। তবে গোয়েন্দাদের ধারণা হামলায় অংশ নেওয়া দুর্বৃত্তরা ভাড়াটে খুনি। কেননা মুছাব্বির কারওয়ান বাজারকেন্দ্রিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকলেও সেখানকার কেউ হামলাকারীদের চিনতে পারেনি। গতকাল তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এসব তথ্য জানান।

তাঁরা বলেছেন, কারওয়ান বাজারে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জড়িয়ে পড়েছিলেন মুছাব্বির। সম্প্রতি হত্যার হুমকি পাচ্ছিলেন বলে তাঁর স্ত্রী পুলিশকে জানিয়েছেন। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে পুলিশ ধারণা করছে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জেরে প্রতিপক্ষের কেউ ভাড়াটে খুনি দিয়ে তাঁকে হত্যা করিয়েছে। এজন্য মুছাব্বিরের প্রধান প্রতিপক্ষ তেজগাঁও থানা যুবদলের বহিষ্কৃত নেতা আবদুর রহমানকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে ডিবি পুলিশ। তবে তাঁর কাছ থেকে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো ক্লু পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে ডিবি সূত্র। গতকাল ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, স্টার কাবাবের পাশের গলিতে আহছানউল্লা ইনস্টিটিউট অব টেকনিক্যাল অ্যান্ড ভোকেশনাল অ্যান্ড ট্রেনিং (এআইটিভিইটি) নামে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ভবনের সামনে এলাকাবাসীর জটলা। এই ভবনের সামনেই গুলি করা হয় মুছাব্বির ও সুফিয়ান বেপারী মাসুদ নামে আরেকজনকে। আশপাশের মানুষ ও দোকানিদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে কেউ কিছু বলতে রাজি হননি। তবে একাধিক সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে কারওয়ান বাজার এলাকায় চাঁদাবাজি নিয়ে স্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের একাধিক নেতা-কর্মীর মধ্যে দ্বন্দ্ব চলে আসছিল। এই বিরোধের জের ধরেই হত্যাকাণ্ডটি ঘটতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর আগে গত ২৯ ডিসেম্বর কারওয়ান বাজারের বিভিন্ন মার্কেটে চাঁদাবাজির প্রতিবাদে ব্যবসায়ীরা মানববন্ধন করলে সেখানে হামলার ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় মামলা হলে পুলিশ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করে। হত্যা মামলার তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যবসায়ীদের ওপর হামলার অভিযোগে যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের এলাকায় আধিপত্যটা কমে গেলে মুছাব্বির সেই জায়গা ‘নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছেন’ বলে অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে এলাকায় বেশ উত্তেজনা চলছিল। এ ছাড়াও ফার্মগেট এলাকায় একটি গ্যারেজ দখল নিয়ে দুই গ্রুপের মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরেই উত্তেজনা চলে আসছে। এই গ্যারেজ দখল ঘটনায় মুছাব্বিরের সংশ্লিষ্টতা পাওয়ার কথা প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানতে পেরেছে পুলিশ। এসব কারণেই মুছাব্বিরের জীবননাশের হুমকির অভিযোগের মিল আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এর পাশাপাশি হত্যার পেছনে রাজনৈতিক কোনো কারণ আছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

এ বিষয়ে ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের ডিসি মো. ইবনে মিজান বলেন, ‘মুছাব্বিরের স্ত্রী মামলা করতে এসে আমাদের বলেছেন, বেশ কিছুদিন ধরেই তাঁর স্বামী জীবননাশের হুমকি পাচ্ছিলেন। তবে কারা তাঁকে হুমকি দিয়েছে সেই বিষয়টি স্পষ্ট করেননি মুছাব্বিরের স্ত্রী। হুমকির ঘটনায় কোনো জিডি বা মামলাও করেনি তাঁর পরিবার। মুছাব্বির হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় চার-পাঁচজনকে অজ্ঞাতনামা উল্লেখ করে মামলা করেছেন তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম। ঘটনাস্থল থেকে ৭.৬৫ বুলেটের তিনটি খোসা উদ্ধার করা হয়। মোটিভ জানতে কারওয়ান বাজারে চাঁদাবাজি, ফার্মগেটে গ্যারেজ দখল ও রাজনৈতিক কারণগুলো সামনে রেখে তদন্ত চলছে।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ওত পেতে থাকা অজ্ঞাতনামা চার-পাঁচজন তাঁদের গতিরোধ করে পিস্তল দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি করতে থাকে। তাতে মুছাব্বিরের ডান হাতের কনুই, পেটের ডান পাশে গুলি লাগে। রক্তাক্ত জখম নিয়ে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তাঁকে বাঁচাতে সুফিয়ান বেপারী এগিয়ে গেলে তাঁকেও পেটের বাঁ পাশে গুলি করে হামলাকারীরা।

গুলির দৃশ্য সিসিটিভিতে : বুধবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে তেজতুরী বাজার এলাকায় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা মুছাব্বিরকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হন তেজগাঁও থানার ভ্যানশ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সুফিয়ান বেপারী মাসুদ। সিসিটিভিতে দেখা গেছে হত্যাকাণ্ডের পুরো দৃশ্য। এতে দেখা যায়, স্টার কাবাবের পেছনের গলিতে বস্তা নিয়ে বসে ছিল দুই দুর্বৃত্ত, স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মুছাব্বিরকে দেখামাত্র বস্তা থেকে পিস্তল বের করে পেছন থেকে গুলি করে তারা। এতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। আবার উঠে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন মুছাব্বির। এ সময় মুছাব্বিরের ফোন পড়ে যায়। শুটাররা সেই ফোন নিয়েই পালিয়ে যায়।

নয়াপল্টনে জানাজা অনুষ্ঠিত : গতকাল দুপুরে নয়াপল্টনে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে মুছাব্বিরের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের কেন্দ্রীয় ও মহানগর পর্যায়ের বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী অংশ নেন। এর আগে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে পুলিশ মুছাব্বিরের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে। পরে লাশ নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে নিয়ে আসা হয়। জানাজায় উপস্থিত ছিলেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হক, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্যসচিব তানভীর আহমেদ রবিন এবং ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এস এম জাহাঙ্গীরসহ কেন্দ্রীয় ও মহানগর নেতারা। জানাজা শেষে মুছাব্বিরের লাশ কারওয়ান বাজারে তাঁর বাসা গার্ডেন ভিউতে নেওয়া হয়। সেখানে দ্বিতীয় জানাজা শেষে তাঁর লাশ আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়।

শনিবার সারা দেশে বিক্ষোভ : মুছাব্বিরকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে স্বেচ্ছাসেবক দল। আগামীকাল শনিবার ঢাকাসহ সারা দেশে এই কর্মসূচি পালন করা হবে। গতকাল রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নিচে মুছাব্বিরের জানাজার আগে এই কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights