মোটা চাল কেটে হচ্ছে মিনিকেট নাজিরশাইল

আবদুর রহমান টুলু, বগুড়া

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে প্রায় ৩০ প্রজাতির ধান বিলীন হলেও মোটা চাল আধুনিক মেশিনে কেটে বা পলিশ করে বানানো হচ্ছে সরু চাল মিনিকেট ও নাজিরশাইল। শুধু বগুড়ায় নয়, সারা দেশে মিনিকেট ও নাজিরশাইল নামে কোনো ধানের জাত না থাকলেও এই নামে প্রতারণার মাধ্যমে রমরমা বাণিজ্য চলছে দীর্ঘদিন ধরে। এক শ্রেণির চালকল মালিক মোটা চাল ছেঁটে সরু করে মিনিকেট ও নাজিরশাইল বলে বাজারজাত করে বিপুল পরিমাণ মুনাফা লুটে নিচ্ছে। এদিকে জেলা খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বিভিন্ন মোটা জাতের ধানের চালকে পলিশ করে সুন্দর করা হয়। এ ছাড়া চালের ওপরের লাল আবরণ মেশিনের মাধ্যমে পরিষ্কার করা হয়ে থাকে।

বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ সূত্রে জানা গেছে, জেলায় বিভিন্ন মৌসুমে প্রায় ১৮৫ প্রজাতির ধান আবাদ হয়ে থাকে। এর মধ্যে খরিপ-১ আউশ মৌসুমে ২৮ প্রজাতির ধান উৎপাদন হয়। এরপর রোপা আমন মৌসুমে উচ্চ ফলনশীল (উফশী) জাতের ৫২ প্রজাতির ও হাইব্রিড জাতের ২০ প্রজাতির ধান উৎপাদন হয়ে থাকে। এ ছাড়া স্থানীয় জাতের ৭ প্রজাতির ধানের আবাদ করে থাকেন স্থানীয় কৃষকরা। বোরো মৌসুমে উফশী জাতের ৪২ প্রজাতির ও হাইব্রিড জাতের ৩৬ প্রজাতির ধান উৎপাদন হয় বগুড়া অঞ্চলে। বর্তমানে বগুড়ায় উৎপাদিত ধানের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশই হাইব্রিড জাতের। অথচ বাজারে গেলে ব্রি-২৮, পাইজামসহ আরও দুই-একটি জাত ছাড়া অন্য প্রকার ধানের চাল পাওয়া যায় না। ধান থেকে যখন চাল করা হয় তখন কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৮ থেকে ১০ প্রজাতির ধান একত্রে করে চাল করা হচ্ছে। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে প্রায় ৩০ প্রজাতির ধান বিলুপ্তি হয়েছে। এগুলো হচ্ছে- নাজিরশাইল, বেগুন বিচি, গড়ে, কাতান, দুলাভোগ, ঘাসি কলসী, মালা, চাঁন্দিনা, খাটো বাদার, পোড়া খমন, বনসার, খলসি, কালমনা, হাসকল, জটা, কাশেবান্দা ও বকুরি।

জানা যায়, মিনিকেট, কাটারীভোগ, পাইজাম, চিনিগুড়া, নাজিরশাইল, বিআর ২৮, বিআর ২৯ সব চাল বানানোর বাজার বগুড়ার সান্তাহার। মিল মালিকরা আধুনিক মেশিনের মাধ্যমে হাইব্রিড জাতের মোটা ধানের চালকে বিভিন্ন নাম দিয়ে বাজারে সরবরাহ করছেন। এই চিত্র শুধু সান্তাহারই নয়, বগুড়ার দুপচাঁচিয়া, শেরপুর শহরের তিন শতাধিক অটোমেটিক রাইস মিলে মোটা চাল কেটে বা পলিশ করে নামি দামি জাতের ব্রান্ডিং করা হয়। শুধু সান্তাহার শহরেই ২০টির বেশি এরকম অটোরাইস মিল রয়েছে। মিল মালিকরা অটোরাইস মিলে মিনিকেট, কাটারি, পাইজাম, বিআর ২৮, বিআর ২৯, চিনিগুড়া, নাজিরশাইল চাল উৎপাদন করছেন। বাজারে মিনিকেট ও নাজিরশাইল নামে চাল পাওয়া যায়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্রি-২৮ এবং কিছু ক্ষেত্রে ব্রি-২৯ ধান কেটে মিনিকেট নামে বাজারজাত করা হয়। একইভাবে ব্রি ২৯ ধান অধিক ছাঁটাই ও পলিশ করে চালের নাম দেওয়া হয় নাজিরশাইল। দেশে মিনিকেট ও নাজিরশাইল নামে কোনো ধানের জাত না থাকলেও এই নামে প্রতারণার মাধ্যমে রমরমা বাণিজ্য চলছে দীর্ঘদিন ধরে। এক শ্রেণির চালকল মালিক মোটা চাল ছেঁটে সরু করে মিনিকেট ও নাজিরশাইল বলে বাজারজাত করে মুনাফা লুটে নিচ্ছেন। প্রতিটি অটোরাইস মিলে রয়েছে একটি ডিজিটাল সেন্সর প্লান্ট। এর মধ্যে দিয়ে যেকোনো ধান বা চাল পার হলে সেটি থেকে প্রথমে কালো, ময়লা ও পাথর সরিয়ে ফেলা হয়। এরপর মোটা ধান চলে যায় অটোমিলের বয়লার ইউনিটে। সেখানে পর্যায়ক্রমে পাঁচটি ধাপ পার হওয়ার পর লাল কিংবা মোটা চাল সাদা রং ধারণ করে। এরপর আসে পলিশিং মেশিনে। অতি সূক্ষ্ম এই মেশিনে মোটা চালের চারপাশ কেটে চালটিকে চিকন আকারে নিয়ে আসা হয়। এরপর সেটি আবারও পলিশ ও স্টিম দিয়ে চকচকে শক্ত করে। শেষে এই চাল কথিত এবং আকর্ষণীয় মিনিকেট চালে পরিণত হয়।

বগুড়ার শেরপুর উপজেলার সাদুবাড়ী এলাকার চাল ব্যবসায়ী সান এন্টারপ্রাইজের মালিক গোলাম রব্বানী জানান, অটোরাইস মিলগুলোতে মোটা চাল ছেঁটে বা পলিশ করে চিকন করা হয়। এসব রাইস মিল থেকে চাল কিনে বিভিন্ন কোম্পানি তাদের নিজের নামে বাজারজাত করে থাকে। এ ছাড়া এসব চাল ঢাকা ও বাণিজ্যিক শহর চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলা শহরে বিক্রি করা হচ্ছে।

বগুড়া সদর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হারুন-উর-রশিদ জানান, বিভিন্ন মোটা জাতের ধানের চালকে পলিশ করে সুন্দর করা হয়। এ ছাড়া চালের ওপরের লাল আবরণ মেশিনের মাধ্যমে পরিষ্কার করা হয়। বাজারে অনেক ব্র্যান্ডের চাল বিক্রি হচ্ছে। চালকল মালিকরা অটোরাইস মিলে চাল তৈরি করে নিজস্ব নামে ব্র্যান্ডিং করে বাজারে দিচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights