মোদি সরকারের সিদ্ধান্তে ‘সাধারণ ভারতীয়রাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে’: শশী থারুর
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আগামী সপ্তাহে ভারতের সংসদে পেশ হতে যাওয়া প্রস্তাবিত ‘ফরেন কন্ট্রিবিউশন (রেগুলেশন) অ্যামেন্ডমেন্ট বিল, ২০২৬’-এর তীব্র সমালোচনা করেছেন কংগ্রেস সংসদ সদস্য শশী থারুর। বিলটিকে প্রশাসনিক ক্ষমতার এক বিপজ্জনক কেন্দ্রীকরণ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করেছেন যে, এই আইন পাস হলে ভারতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা ও নাগরিক সমাজের মধ্যকার মৌলিক সম্পর্কের গতিপথ পুরোপুরি বদলে যাবে।
কেরালার তিরুবনন্তপুরমের এই সংসদ সদস্য ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের কঠোর সমালোচনা করে অভিযোগ করেন যে, মোদি সরকার তার সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী আদর্শ এবং স্বাধীন কণ্ঠস্বরের প্রতি অ্যালার্জি থেকে চালিত হয়ে এই পদক্ষেপ নিচ্ছে।
কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ এই নেতা তার নিবন্ধে উল্লেখ করেন, বর্তমান সরকার অলাভজনক দাতব্য সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে না দেখে বরং নাশকতা ও রাজনৈতিক চক্রান্তের উৎস হিসেবে বিবেচনা করছে। এসব নিরপেক্ষ ও স্বাধীন কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করতে তাদের মূল দুর্বলতা অর্থাৎ আন্তর্জাতিক দাতব্য তহবিলের ওপর নির্ভরশীলতাকে লক্ষ্যবস্তু করেছে রাষ্ট্র। এফসিআরএ আইনে একাধিক কঠোর সংশোধনী আনার কারণে ইতিমধ্যেই তৃণমূল পর্যায়ে অনুদান প্রদান নিষিদ্ধ করা, প্রশাসনিক খরচের সীমা কমিয়ে আনা এবং দিল্লির একটি নির্দিষ্ট ব্যাংক শাখায় সব বৈদেশিক লেনদেন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর ফলে দেশে বৈদেশিক অনুদান ৮৭ শতাংশ কমে গেছে এবং হাজার হাজার ধর্মনিরপেক্ষ ও সামাজিক উন্নয়নমূলক সংস্থা বন্ধ হতে বাধ্য হয়েছে।
প্রস্তাবিত নতুন এই বিলে সরকার কোনো সংস্থার এফসিআরএ নিবন্ধন বাতিল, প্রত্যাহার বা নবায়ন না হলে সেই সংস্থার বিদেশে প্রাপ্ত তহবিল ও তার মাধ্যমে গড়ে ওঠা সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ নিয়ন্ত্রণের জন্য ‘ডেসিগনেটেড অথরিটি’ বা একটি নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ গঠনের পরিকল্পনা করেছে। তবে কোনো ধর্মীয় উপাসনালয় এর অন্তর্ভুক্ত থাকলে ওই কর্তৃপক্ষকে তার ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য বজায় রাখার বিধান দেওয়া হয়েছে। থারুর মনে করেন, আদালত বা ঐতিহ্যগত আইনি সুরক্ষাকে পাশ কাটিয়ে কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করে সরাসরি জমি বা ভবন বাজেয়াপ্ত করার এই ব্যবস্থা এক অভূতপূর্ব নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে, যা প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিরতরে পঙ্গু করে দেবে।
নিজের রাজ্য কেরালার উদাহরণ টেনে শশী থারুর জানান, এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে খ্রিষ্টান ধর্মীয় ট্রাস্ট পরিচালিত স্কুল, হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো কোনো জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে প্রান্তিক মানুষের সেবা দিয়ে আসছে। স্থানীয় অনুদান, ফি এবং বৈচিত্র্যময় বৈদেশিক অনুদানের ওপর নির্ভর করেই এসব প্রতিষ্ঠান বিশ্বমানের চিকিৎসা সরঞ্জাম ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করে থাকে। কিন্তু নতুন আইনের ফলে কোনো কারণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিকূল সিদ্ধান্ত বা প্রশাসনিক বিলম্বের জেরে একটি সচল ৫০০ শয্যার দাতব্য হাসপাতাল মুহূর্তেই সরকারি সম্পত্তিতে পরিণত হতে পারে। এতে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ও জনসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে এবং আলটিমেটলি সাধারণ ভারতীয় নাগরিকরাই এর শিকার হবেন।
ভারতীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ১৩,৫২০টি সংস্থা মোট ৫৫,৭৪১ কোটি রুপির বৈদেশিক অনুদান গ্রহণ করেছে। এ ছাড়া এফসিআরএ পোর্টালের তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৫ জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৪,৪৪৯টি সক্রিয় এফসিআরএ সনদ রয়েছে, অন্যদিকে ২২,৪৯৮টি সনদ বাতিল করা হয়েছে এবং ১৫,২১২টি সনদের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে ভারতের উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত এসব সংস্থাকে এমন শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখোমুখি করাকে চরম অন্যায় হিসেবে আখ্যা দিয়ে এই অগণতান্ত্রিক বিলে রুখে দাঁড়াতে সংসদের সব বিরোধী দলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন শশী থারুর।
সূত্র: এনডিটিভি
