যাকাতে দারিদ্র বিমোচনের পথরেখা

যাকাত আরবি শব্দ। ধর্মীয় অর্থে পবিত্রতা, পরিশুদ্ধি। আর অর্থনৈতিক পরিভাষায় সমৃদ্ধি। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি হওয়ায় যাকাতকে কেবলই ধর্মীয় বিষয়-আসয় মনে করার প্রবণতা রয়েছে। ধরেই নেয়া হয়, ধনীদের সম্পদের কিছু অংশ দরিদ্রদের কাছে পৌঁছে বলে যাকাত একটি ইবাদত মাত্র। আসলে এটি খণ্ডিত বা আংশিক বুঝ। যাকাতের মধ্যে রয়েছে অর্থনীতির বিশাল উপাদান। দারিদ্র ও প্রাচুর্যের ভারসাম্য না থাকলে রাষ্ট্র কাঠামোগত সমস্যায় পড়ে। দেখা যায়, এইতো প্রাচুর্যের ছন্দ; পরে হঠাৎ করে দারিদ্রের ভয়াল থাবা। কারো কারো জন্য প্রাসাদের মত আলীশান বাড়ি। বিলাসবহুল গাড়িসহ সুখের সব রকম সরঞ্জামাদির বিপুল সমাহার। সমান্তরালে কারো কারো ক্ষেত্রে হাড় ভাঙ্গা খাটুনি পরিশ্রমের পরও দু’মুঠু ভাতের নিশ্চয়তা নেই, নেই মাথা গোজার ঠাঁই।

দেশে বৈষম্যের কারণ প্রায় অভিন্ন। দারিদ্রের কারণে অশিক্ষিত রয়ে যায়, সমাজের একটি বিশাল অংশ যার কারণে বেকারত্ব বাড়ছে আলোর গতিতে। দারিদ্র ও বেকারত্বের অমানিশায় পতিত হয়ে হতাশা কাটানোর জন্যে মাদকাসক্তিতে লিপ্ত হচ্ছে। ক্রমান্বয়ে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি খুনসহ মারাত্মক অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে লাখ লাখ সম্ভামনাময় নবপ্রজন্ম। এসব অপরাধ বাড়ার কারণে জনমনে সৃষ্টি হচ্ছে আতংক, কষ্ট সাধ্য হয়ে যাচ্ছে নাগরিক জীবনযাপন, আইন-শৃঙ্খলার অবনতিসহ যাবতীয় উন্নয়ন। অগ্রগতি হচ্ছে বাধাগ্রস্ত, পিছিয়ে যাচ্ছে দেশ। আন্তর্জাতিকভাবে বদনাম-নিন্দার শিকার হয় দেশ ও জনগণ।

দারিদ্র্য আর প্রাচুর্য বিপরীতমুখী দুটি বিষয়। অর্থনীতিতে এ শব্দ দুটি একটি আরেকটির কারণও। কোনো রাষ্ট্রে বা সমাজের বৈষম্য নির্দেশ হয় দারিদ্র্য আর প্রাচুর্যে। যেসব দেশ এর নিগূঢ় ফের বুঝেছে তারা যাকাতের সুষ্ঠু বন্টন-ব্যবহারে তাদের অর্থনীতিকে বড় রকমের ভারসাম্যে আনতে পেরেছে। অবশ্য নামে যাকাত ব্যকহার করেনি সবাই। সেক্টরও ভাগ করে দিয়েছে। ইন্দোনেশিয়ায় গড়ে তোলা হয়েছে ডম্পেট ডুফা। অর্থ এতিমদের মানিব্যাগ। এটি ধনীদের থেকে জাকাত, সদকা ও ওয়াকফ্কৃত সম্পদ সংগ্রহ ও রক্ষণাবেক্ষণ করে। সেখান থেকে দরিদ্রদের সহায়তা করা হয়। সুদানেও গড়ে তোলা হয়েছে এ ধরনের তহবিল। নাম দেয়া হয়েছে আল-আমান মাইক্রোফাইন্যান্স। দেশটির ব্যাংক অব খার্তুমের অধীনে ২০০৯ সালে এটির প্রতিষ্ঠা। সুদানের যাকাত ব্যবস্থাপনা সংস্থার নাম দিওয়ান জাকাত। দিওয়ান যাকাত প্রতিবছর সংগৃহীত অর্থের ২৫ শতাংশ দেয় আল-আমান মাইক্রোফাইন্যান্সকে। এ অর্থের একটা বড় অংশ ব্যয় হয় সুদানের উৎপাদনশীল বাণিজ্য, কৃষি ও কারিগরি খাতে। মালয়েশিয়ায়ও যাকাতের জন্য একটি দপ্তর রয়েছে, যা যাকাত সংগ্রহ করে দরিদ্রদের শিক্ষা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থান খাতে খরচ করে থাকে। সৌদি আরবের কেন্দ্রীয় যাকাত কর্তৃপক্ষ কর্পোরেট লেভেলেও যাকাত সংগ্রহ করে।

পরিকল্পিত, লক্ষ্যভিত্তিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক যাকাত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সমাজ থেকে দারিদ্র্য নিরসনের দৃষ্টান্ত এখন দেশে দেশে। মুসলিম বা ইসলামী নয়, এমন দেশও অর্থনীইতর ভারসাম্য বিশেষ করে ধনী-দরিদ্রের মফাৎ কমাতে যাকাতের ধারনা বাস্তবায়ন করছে। যেসব মুসলিম দেশে যাকাত বা এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর নেই, সেসব দেশে ধনীরা ধন আরও জমায়, গরিবরা আরও গরিব হয়, বৈষম্য বাড়ে, সামাজিক অস্থিরতা বাড়ে, এবং অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ে। অপরদিকে, যাকাত কার্যকর থাকলে অর্থনীতিতে ভারসাম্য আসে, সকল শ্রেণির মানুষ উপকৃত হয়, এবং সামগ্রিকভাবে একটি সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে ওঠে। মুসলিম প্রধান দেশ হিসেবে বাংলাদেশে যাকাত ব্যবস্থা বহুল প্রচলিত। তবে দেশে যাকাত ব্যবস্থা সংগঠিত নয়। মূলত বিত্তবান ও সামর্থ্যবানরা নিজ উদ্যোগে কিছু যাকাত বণ্টন করেন। আবার অনেকে কেন্দ্রীয় যাকাত বোর্ডেও তা জমা দেন। সেখান থেকে যাকাত বণ্টন হয়। তবে কেন্দ্রীয়ভাবে সংগ্রহ ও বণ্টিত না হওয়ায় বাংলাদেশে জাকাতের পূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে না।

যাকাত দেশের অর্থনীতি বা দারিদ্র্য বিমোচনে কেমন অবদান রাখতে পারে তা উঠে এসেছে বছর কয়েক আগে বিশ্বব্যাংক ও ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক- আইডিবির এক প্রতিবেদনে। ‘ইসলামিক ফাইন্যান্স: এ ক্যাটালিস্ট ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি’ শীর্ষক প্রতিবেদনটিতে মুসলিম দেশগুলোয় যাকাতের অর্থনীতির কতটুকু, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সম্পদের ব্যবধান বা কতটা, আর সে দারিদ্র্য বিমোচনে জাকাত কী ভূমিকা রাখতে পারে ইত্যাদি বিষয় উঠে এসেছে। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) হিসেবে ১০টি দেশে যাকাতের অবদান প্রাক্কলন করা হয়েছে প্রতিবেদনটিতে। এতে দেখা যায়, বিভিন্ন মুসলিম দেশের মধ্যে বাংলাদেশে জাকাতের অর্থনীতির সম্ভাবনা অনেক বেশি, যার পরিমাণ জিডিপির এক দশমিক ৬৩ শতাংশ। বিশ্বের মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে এ হার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। প্রতিবেদনের তথ্যমতে, জাকাতের অর্থনীতির সবচেয়ে বেশি পাকিস্তানে, যার পরিমাণ জিডিপির এক দশমিক ৭৪ শতাংশ। এরপর রয়েছে বাংলাদেশ। তৃতীয় অবস্থানে থাকা ইন্দোনেশিয়ার জাকাতের অর্থনীতির পরিমাণ জিডিপির এক দশমিক ৫৯ শতাংশ। চতুর্থ অবস্থানে থাকা সুদানের জিডিপির এক দশমিক ৪৪ শতাংশ ও পঞ্চম স্থানে থাকা মালয়েশিয়ার জিডিপির এক দশমিক ১১ শতাংশ রয়েছে যাকাতের অর্থনীতি। এছাড়া নাইজেরিয়ার দশমিক ৮৬, তানজানিয়ার দশমিক ৫৪, ভারতের (মুসলিম জনগোষ্ঠী) দশমিক ২৬, কেনিয়ার দশমিক ১৩ ও দক্ষিণ আফ্রিকার দশমিক শূন্য তিন শতাংশ যাকাতের অর্থনীতি।

বাংলাদেশে যাকাতের মাধ্যমে দারিদ্র কাটানো ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সম্ভাবনা বেশ উজ্জল। কিন্তু এর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা না থাকায় এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যায়নি। যাকাতের প্রধান লক্ষ্য দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থিক উন্নয়ন, সামাজিক ভারসাম্য ও দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা। উন্নত দেশগুলোতেও সম্পদের কেন্দ্রীকরণ এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দারিদ্র্যের প্রকোপ ক্রমেই বাড়ছে। বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগে জাকাত সংগ্রহ ও বিতরণ আরও সহজতর করতে ডিজিটাল পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে জাকাত প্রদান এবং এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব। তা সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখা রোধ করে এবং ধনীদের থেকে দারিদ্র্যসীমার নিচের মানুষের কাছে সম্পদ স্থানান্তরের মাধ্যমে সামাজিক বৈষম্য কমাবে। শুধু খাদ্য বা নগদ অর্থ না দিয়ে, সংগৃহীত জাকাতের অর্থ দিয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোকে ক্ষুদ্র ব্যবসা বা উৎপাদনশীল উপকরণের ব্যবস্থা করে স্বাবলম্বী করা যায়।

রাষ্ট্রীয় বা সু-সংগঠিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যাকাত আদায় ও বণ্টন করলে এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হবে। হতদরিদ্রদের চিহ্নিত করাও সহজ হবে। কাজটি করলে যাকাতদাতার একটা শুমারি হয়ে যাবে। যাকাতের অর্থ থেকে এমন প্রকল্প গ্রহণ করা যা মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে, তাদের ভিক্ষাবৃত্তি থেকে দূরে রাখতেও সহায়তা করবে। সর্বোপরি পরিকল্পিত যাকাত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারগুলোকে খুঁজে বের করে তাদের স্বাবলম্বী করার ব্যবস্থা নিলে, তা টেকসই দারিদ্র্য বিমোচনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে প্রাচীনকাল হতে মানুষ দু’টি শ্রেণিতে বিভক্ত। ধনী ও দরিদ্র। ধনিক শ্রেণির সম্পদের আধিক্য সীমা ছাড়িয়ে গেছে, আর দরিদ্র শ্রেণি ক্ষীণ হতে হতে মাটির সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে। তেলহীন প্রদীপের মতো নিভু নিভু জীবন প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছে মাত্র। এর কারণ হলো, প্রাচীন ধর্মগ্রন্থসমূহ দরিদ্রের প্রতি দয়া-অনুগ্রহ প্রদর্শনে উৎসাহ দিলেও তা বাধ্যতামূলক করেনি এবং দানের পরিমাণও নির্ধারণ করেনি। পক্ষান্তরে ইসলাম ‘যাকাত’ নামে এমন এক বিধান দিয়েছে, যার মাধ্যমে ধনীদের সম্পদের নির্দিষ্ট অংশ দরিদ্রের মাঝে বণ্টন বাধ্যতামূলক করে দারিদ্র্য বিমোচনে চূড়ান্ত ভূমিকা পালন করেছে। ইসলামে যাকাতের মূল উদ্দেশ্য হলো সমাজের বিত্তবানদের থেকে নির্দিষ্ট অংশ দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করা, যাতে সম্পদের সুষম বন্টন নিশ্চিত হয়। যাকাত শুধুমাত্র একটি দাতব্য কাজ নয়, বরং এটি একটি বাধ্যতামূলক কর্তব্য, যা মুসলিম সমাজের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

বাংলাদেশে যাকাত বোর্ড নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যা ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীনে ইসলামিক ফাউন্ডেশন দ্বারা পরিচালিত হয়। তবে সরকারি পর্যায়ে যাকাত ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতার অভাব রয়েছে। অধিকাংশ যাকাত বেসরকারি সংস্থাগুলোর মাধ্যমে সংগ্রহ ও বিতরণ করা হয়, যা অনেক সময় অনিয়মের শিকার হয়। সরকার একটি নির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করলে, যাকাত বোর্ডকে শক্তিশালী করে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে এর ব্যবস্থাপনা করলে তা কেবল দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্য বিমোচন করবে না, অর্থনীতিকেও ভিত্তি দেবে। তাই যাকাতকে ধর্মীয় অনুশীলনের সমান্তরালে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক-অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারমূলক ব্যবস্থায় আনতে হবে। রাষ্ট্র যাকাত ব্যবস্থাকে সঠিকভাবে কার্যকর করতে পারলে তা ধীরে ধীরে দারিদ্র্য হ্রাস, অর্থনৈতিক ভারসাম্য, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং মানবিক মূল্যবোধ বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্রের সিঁড়িতে নেবে।

এরইমধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মাঝে সেই অভিপ্রায়ের প্রকাশ ঘটেছে। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এতিম ও ওলামা মাশায়েখদের সম্মানে ইফতারের আয়োজনে অভিমত জানিয়ে তিনি বলেছেন, যাকাতের সঠিক বন্টন হলে ১০-১৫ বছরে দেশের দারিদ্র বিমোচন সম্ভব। এজন্য যাকাত নিয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করছে বলেও জানান তিনি। দারিদ্র বিমোচনের জন্য যাকাত ব্যবস্থাকে বাস্তব রূপ দিতে আলেম-ওলামাদের সহযোগিতাও চান প্রধানমন্ত্রী। নিঃসন্দেহে এটি দেশের জন্য একটি বড় রকমের আশা জাগিনয়া খবর।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights