যান্ত্রিক সভ্যতার ভিড়ে আজও ছুটছে সামসুল হকের ঘোড়ার গাড়ি

পাবনা প্রতিনিধি

আধুনিক যান্ত্রিক যানবাহনের ভিড়ে পাবনার ভাঙ্গুড়ায় এখনো চোখে পড়ে হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যবাহী ঘোড়ার গাড়ি। উপজেলার চর ভাঙ্গুড়া গ্রামের বাসিন্দা সামসুল হক গত ছয় বছর ধরে নিজের প্রয়োজনেই ব্যবহার করছেন এই প্রাচীন বাহনটি। ব্যস্ত সড়কে যখন দ্রুতগতির ট্রাক, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলের আধিপত্য, তখন সামসুল হকের ধীরগতির ঘোড়ার গাড়ি পথচারীদের ফিরিয়ে নেয় পুরনো দিনের গ্রামবাংলায়। আধুনিকতার চাপে পিষ্ট হয়েও তাঁর এই ব্যতিক্রমী যাতায়াত কেড়ে নিচ্ছে সবার দৃষ্টি।

এক সময় গ্রামবাংলার পথে ঘোড়ার গাড়ি ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। হাট-বাজারে যাতায়াত কিংবা কৃষিপণ্য আনা–নেওয়ায় এই বাহনের ব্যবহার ছিল খুবই সাধারণ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইঞ্জিনচালিত যানবাহনের দাপটে সেই দৃশ্য আজ প্রায় বিলুপ্ত। ফলে সামসুল হকের ঘোড়ার গাড়িটি এখন আর শুধু একটি বাহন নয়—এটি হয়ে উঠেছে হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ জীবনের প্রতীক।

স্থানীয় পথচারী রাসেল রহমান বলেন, এখন ঘোড়ার গাড়ি খুব একটা দেখা যায় না। উনাকে দেখলে মনে হয় পুরোনো গ্রামবাংলার একটা অংশ এখনও বেঁচে আছে।

আরও কয়েকজন স্থানীয় জানান, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক যানবাহন চালানো সামসুল হকের জন্য সহজ নয়। নিজের দৈনন্দিন প্রয়োজন, বিশেষ করে ঘাস ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বহনের জন্য তিনি ঘোড়ার গাড়িটিই ভরসা হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

এ বিষয়ে সামসুল হক বলেন, এই ঘোড়ার গাড়িটা আমার বহুদিনের অভ্যাস। ছোটবেলা থেকেই দেখেছি ও ব্যবহার করেছি। এখনো নিজের কাজেই চালাই।

প্রতিদিন ভোরে তিনি মাঠে ঘাস কাটেন কিংবা ক্ষেত থেকে ঘাস সংগ্রহ করেন। পরে সেই ঘাস ঘোড়ার গাড়িতে করে বাড়ি ফেরেন। তাঁর জীবনে নেই কোনো তাড়াহুড়া, নেই গতি বাড়ানোর প্রতিযোগিতা—সবকিছু চলে নিজস্ব ছন্দে। রোদ-বৃষ্টি কিংবা শীত—সব পরিস্থিতিতেই তাঁকে পথে থাকতে হয়। এই পথচলাই তাঁর দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

যান্ত্রিক যানবাহনের ভিড়ে ঘোড়ার গাড়ি অনেক সময় অন্যদের বিরক্তির কারণ হলেও সামসুল হক সেদিকে কর্ণপাত করেন না। কেউ হর্ন বাজালেও বা বিরক্তিকর মন্তব্য করলেও তিনি নির্লিপ্ত থাকেন।

ভাঙ্গুড়া বাজারের দোকানদার আব্দুল্লাহ বলেন, অনেকে বিরক্ত হয়, কিন্তু উনি কাউকে আটকানোর জন্য চালান না। নিজের প্রয়োজনেই চলেন।

স্থানীয় কলেজছাত্রী সুরাইয়া পারভীন বলেন, উনাকে দেখলে মনে হয় উন্নয়ন মানেই শুধু গতি নয়। কিছু মানুষ এখনও আগের মতোই জীবনযাপন করেন।

এলাকায় সামসুল হক এখন অনেকের কাছেই পরিচিত মুখ। কেউ থেমে তাকিয়ে দেখে, কেউবা ছবি তোলে। দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা যত আধুনিক হচ্ছে, ততই হারিয়ে যাচ্ছে এমন চিরচেনা দৃশ্য। যান্ত্রিক সভ্যতার ভিড়ে সামসুল হকের ঘোড়ার গাড়ি তাই হয়ে আছে হারিয়ে যাওয়া গ্রামীণ জীবনের এক নীরব সাক্ষী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights