যুক্তরাষ্ট্রে গৃহযুদ্ধ থেকে বিশ্ব অর্থনীতির পতন, ‘চীনের নস্ত্রাদামুসের’ ভয়ঙ্কর ভবিষ্যদ্বাণী

অনলাইন ডেস্ক
‘চীনের নস্ত্রাদামুস’ নামে পরিচিত অধ্যাপক জিয়াং শুয়েচিন ২০২৭ সাল নিয়ে একাধিক উদ্বেগজনক ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। তার পূর্বাভাসের মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে চলমান রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা গৃহযুদ্ধের পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ার আশঙ্কা। খবর ডেইলি মেইলের।

চীনা-কানাডীয় শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জিয়াং শুয়েচিনের সমর্থকদের দাবি, তার একাধিক ভূ-রাজনৈতিক পূর্বাভাস ইতোমধ্যে সত্য হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়। এমনকি ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে—এমন পূর্বাভাসও তিনি দিয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়।

জিয়াং শুয়েচিনের মতে, ইরান যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে আগামী বছর দেশটিতে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। সম্প্রতি এক পডকাস্টে উপস্থাপক জ্যাক নিলের সঙ্গে আলাপকালে এসব পূর্বাভাসের কথা জানান তিনি।

জিয়াং শুয়েচিন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে গৃহযুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় অনেক উপাদান ইতোমধ্যে বিদ্যমান। দেশজুড়ে অসন্তোষ, দাঙ্গা, বিক্ষোভ ও বিদ্রোহের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। একই সময়ে ২০২৭ সালের মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতিও ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

ইরানের পরিস্থিতি নিয়েও বিশেষ সতর্কবার্তা দিয়েছেন জিয়াং। তার পূর্বাভাস, চলমান সংঘাত একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেবে এবং একপর্যায়ে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে স্থল অভিযান পরিচালনা করতে হতে পারে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র আরও দীর্ঘ সময় মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে। তার মতে, এই সম্পৃক্ততা ১০ বছর পর্যন্তও স্থায়ী হতে পারে।

এরপর ইরানে যুদ্ধরত মার্কিন স্থলবাহিনীর সদস্যসংখ্যা বাড়াতে সরকার জাতীয় পর্যায়ে বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ ব্যবস্থা পুনরায় চালু করতে পারে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেন তিনি। এমনটি হলে ১৮ বছর বয়সী তরুণদেরও সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে হতে পারে বলে তার দাবি।

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও সতর্ক করেছেন জিয়াং। তার পূর্বাভাস অনুযায়ী, দেশটির প্রতিটি বড় শহরে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) বাহিনীর উপস্থিতি ও ক্ষমতা আরও বাড়বে। এরপর অর্থনৈতিক পতন এবং ব্যাপক দাঙ্গা-বিক্ষোভ দেখা দিতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতির দিকে গড়াতে পারে।

ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিজের পূর্বাভাস দেওয়ার পদ্ধতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জিয়াং শুয়েচিন বলেন, তিনি তিনটি প্রধান কৌশল অনুসরণ করেন। এর একটি হলো দেশ ও রাষ্ট্রীয় নেতাদের পোকার খেলোয়াড়ের সঙ্গে তুলনা করা। তিনি প্রত্যেকের কাছে ‘বিজয়ী’ বলতে কী বোঝায়, তা বোঝার চেষ্টা করেন এবং সেই লক্ষ্য অর্জনে তারা পরবর্তী সময়ে কী পদক্ষেপ নিতে পারেন, তা অনুমান করেন।

এরপর বর্তমান ঘটনাবলিকে অতীতের অনুরূপ সংকট ও বিপর্যয়ের সঙ্গে তুলনা করেন তিনি। তার ভাষ্য, কোনো আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র অতীতে দীর্ঘ কোনো যুদ্ধে আটকে পড়ার উদাহরণ পাওয়া গেলে সেটিকে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত প্রমাণ হিসেবে নয়, বরং সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচনা করেন তিনি।

এ ছাড়া সবচেয়ে সক্রিয় ও প্রভাবশালী নাগরিকরা ইতোমধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে কী ধারণা পোষণ করছেন, সেটিও তিনি বিশ্লেষণ করেন। ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ব্যক্তিরা বাইবেলের শেষ সময়ের ভবিষ্যদ্বাণীতে বিশ্বাস করেন কি না, সেই বিষয়ও তার বিবেচনায় থাকে বলে জানান জিয়াং।

জিয়াংয়ের দাবি, ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বাস করেন, ঈশ্বর তাকে যুক্তরাষ্ট্রকে রক্ষা করার দায়িত্ব দিয়েছেন। তার মতে, ইরানে যুদ্ধ জয় করা ট্রাম্পের কাছে মূল বিষয় নয়; বরং ক্ষমতা ধরে রাখা এবং ২০২৮ সালে তৃতীয়বার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথ তৈরি করাই তার প্রধান লক্ষ্য হবে।

গত এপ্রিলে এক পডকাস্টে জিয়াং শুয়েচিন বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ কেবল আরও বাড়তে থাকবে এবং এ সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার পথ থাকবে না। তার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ইরানে মার্কিন স্থল অভিযান হতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্র সেখানে অন্তত চার বছর আটকে থাকতে পারে। তবে তার মতে, এই সময়কাল ১০ থেকে ২০ বছর পর্যন্তও দীর্ঘ হতে পারে।

২০২৭ সালের মধ্যে আইসিই প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠবে বলেও পূর্বাভাস দিয়েছেন জিয়াং। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সরকার অর্থনৈতিক পতনের প্রস্তুতি হিসেবে দেশটির প্রধান শহরগুলোতে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করতে চাইতে পারে। তবে ট্রাম্প এ বিষয়ে উদ্বিগ্ন নন বলে মনে করেন তিনি। জিয়াংয়ের ভাষ্য, ট্রাম্পের প্রধান লক্ষ্য হবে তৃতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘বাঁচানো’।

বিশ্ব অর্থনীতির সম্ভাব্য পতন নিয়ে নিজের চতুর্থ ভবিষ্যদ্বাণ্যের ব্যাখ্যায় জিয়াং হরমুজ প্রণালির দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার কথা উল্লেখ করেন। তার মতে, এই জলপথ দিয়ে তুলনামূলক কম খরচে জ্বালানি পরিবহন এবং দ্রুত জাহাজ চলাচল বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

জিয়াংয়ের দাবি, ২০২৬ সালে তার এই পূর্বাভাসের কিছু অংশ ইতোমধ্যে সত্যি হতে দেখা গেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বোমাবর্ষণের পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে তেল, গ্যাস ও সারের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব খাদ্যসহ অন্যান্য পণ্যের দামেও পড়ে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

অধ্যাপক জিয়াং সতর্ক করে বলেন, ২০২৭ সালে হরমুজ প্রণালিতে নতুন করে অচলাবস্থা তৈরি হলে তা বিশ্বব্যাপী অস্থিতিশীলতা বাড়াতে পারে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি এই যুদ্ধে পরাজিত হয়, তাহলে সেটি মার্কিন অর্থনীতির পতনের কারণ হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রে সম্ভাব্য গৃহযুদ্ধ সম্পর্কে নিজের শেষ পূর্বাভাসের ব্যাখ্যায় জিয়াং স্পষ্ট করেন, তিনি মার্কিন ভূখণ্ডে দুটি নিয়মিত সেনাবাহিনীর সরাসরি যুদ্ধের কথা বলছেন না। বরং তার পূর্বাভাস হলো, দেশজুড়ে বিক্ষোভ, দাঙ্গা, ছোটখাটো সংঘর্ষ ও স্থানীয় বিদ্রোহের মতো অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়তে পারে। তার মতে, বড় শহরগুলোতে আইসিই ও ন্যাশনাল গার্ডের উপস্থিতি বাড়ার প্রতিক্রিয়ায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।

এ ছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে ‘বিশ্বায়নবাদী’ ও ‘জাতীয়তাবাদীদের’ মধ্যকার সংঘাত আরও তীব্র হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন ‘চীনের নস্ত্রাদামুস’ নামে পরিচিত জিয়াং শুয়েচিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights