যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে ধাক্কা

অনলাইন ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে বড় ধাক্কা লেগেছে। দেশটির ‘রিসিপ্রোকাল’ শুল্কনীতির প্রভাবই এই রপ্তানি কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। তবে এর বাইরেও দেশটিতে ভোক্তা চাহিদা কমে যাওয়া, উচ্চ সুদের হার ও বৈশ্বিক নানা কারণকেও এই রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ধারায় আঘাত লাগার কারণ হিসেবে দায়ী করা হচ্ছে। তথ্য-উপাত্ত বলছে, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে উল্লেখযোগ্য ধীরগতি দেখা গেছে দেশটিতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে।

বাংলাদেশের প্রতিযোগী ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার মতো দেশ পোশাক রপ্তানিতে স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখলেও বাংলাদেশের এভাবে কমে যাওয়া খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাবিয়ে তুলছে। শুধু যে রপ্তানি কমছে তাই নয়, আরো উদ্বেগের বিষয় হলো দেশটিতে ক্রেতারা বাংলাদেশি পোশাকের দামও কম দিচ্ছেন—যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের টেক্সটাইল ও পোশাক খাতের দপ্তরের (অটেক্সা) সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান এ বিষয়ে বলেন, ‘বৈশ্বিক বাণিজ্যে এখন বড় ধরনের অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। মার্কিন পাল্টা শুল্ক, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি, জ্বালানিসংকট এবং দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা—সব মিলিয়ে রপ্তানি খাতের ওপর চাপ বাড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার। ওই বাজারে রপ্তানি কমে গেলে দেশের পোশাকশিল্প সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরই মধ্যে অনেক বৈশ্বিক ক্রেতা অর্ডার কমিয়েছেন। পণ্যের দামের ওপর চাপ বাড়ছে। ক্রেতারা এখন বড় অর্ডারের বদলে ছোট ও স্বল্পমেয়াদি অর্ডারে ঝুঁকছেন। সামনে আরো কঠিন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।’

মার্কিন সংস্থা অটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানি ছিল ৫৯৯ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭.৮০ শতাংশ কম। জানুয়ারি-মার্চ সময়ে দেশটির মোট আমদানি কমে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৭৭৩ কোটি ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় ১১.৬৩ শতাংশ কম।

বাংলাদেশ থেকে মার্চ ২০২৬-এ যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৬৬ কোটি ৪৯ লাখ ডলার, যা মার্চ ২০২৫-এর তুলনায় ৮.০৮ শতাংশ কম। জানুয়ারি-মার্চ সময়ে রপ্তানি কমেছে ৮.৩৮ শতাংশ, মোট আয় দাঁড়িয়েছে ২০৪ কোটি ডলারে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তা চাহিদা হ্রাস, উচ্চ সুদের হার এবং আমদানি ব্যয়ের অনিশ্চয়তা বৈশ্বিক পোশাক বাণিজ্যে চাপ সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি নতুন ট্যারিফ নীতি ও সরবরাহ শৃঙ্খলের জটিলতাও আমদানি প্রবাহকে প্রভাবিত করছে।

প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে ভিয়েতনাম তুলনামূলক স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে। মার্চে দেশটির রপ্তানি ২.৫২ শতাংশ এবং জানুয়ারি-মার্চ সময়ে ২.৭৭ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে কম্বোডিয়ার প্রবৃদ্ধি আরো শক্তিশালী—মার্চে ১৬.২২ শতাংশ এবং প্রথম প্রান্তিকে ১৭.৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

অন্যদিকে চীনের রপ্তানি বড় ধরনের পতনের মুখে পড়েছে। মার্চে ৩৭.২৪ শতাংশ এবং জানুয়ারি-মার্চ সময়ে ৫২.৯১ শতাংশ কমেছে। ভারতের ক্ষেত্রেও রপ্তানি কমেছে ২৭ শতাংশের বেশি।

মূল্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের পোশাকের ইউনিট মূল্যও কমেছে। মার্চ ২০২৬-এ গড় ইউনিট মূল্য ছিল প্রতি পিস ২.৮৬ ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ২.৭৭ শতাংশ কম। জানুয়ারি-মার্চ সময়ে কমেছে ২.৫৬ শতাংশ।

একই সময়ে রপ্তানি ভলিউমেও পতন দেখা গেছে। মার্চে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ২৩ কোটি ২৭ মিলিয়ন পিস পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৫.৪৬ শতাংশ কম। প্রথম তিন মাসে মোট ভলিউম কমেছে ৫.৯৭ শতাংশ।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু রপ্তানির পরিমাণ নয়, বরং ইউনিট মূল্য বৃদ্ধি ও পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে উচ্চমূল্যের ফ্যাশন ও টেকনিক্যাল টেক্সটাইল খাতে প্রবেশ না বাড়ালে দীর্ঘ মেয়াদে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা কঠিন হবে।

তাঁদের মতে, বৈশ্বিক বাজারে অনিশ্চয়তা আছে। তবে বাংলাদেশ এখনো যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান পোশাক সরবরাহকারী দেশ। কিন্তু টিকে থাকতে হলে উৎপাদন দক্ষতা, সরবরাহ সক্ষমতা এবং বাণিজ্য কূটনীতি আরো শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

বিজিএমইএর প্রথম সহসভাপতি কেডিএস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম রহমান বলেন, ‘বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে তৈরি পোশাক খাতকে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। বিশেষ করে বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় বিঘ্ন ও অস্থিরতা এবং বাংলাদেশের আসন্ন এলডিসি-পরবর্তী উত্তরণ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় উৎপাদন দক্ষতা বাড়ানো, পণ্যের বৈচিত্র্য নিশ্চিত করা এবং উচ্চমূল্যের বাজারে প্রবেশ বাড়ানোর বিকল্প নেই। একই সঙ্গে বাণিজ্য কূটনীতি জোরদার এবং নতুন বাজার অনুসন্ধানেও গুরুত্ব দেওয়ার আহবান জানান তিনি।

বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘মার্কিন বাজারে সামগ্রিকভাবে নেতিবাচক প্রবণতা থাকলেও বাংলাদেশ তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে। চীন বাজার থেকে সরে যাওয়ায় সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে পারলে সামনে বড় সম্ভাবনা রয়েছে। পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে পারলে আরো ভালো করা সম্ভব।’

এপ্রিলের প্রেক্ষাপটে ৩১.২১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি

এদিকে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ৩১.২১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও বিশ্লেষকরা বলছেন, গত বছরের বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় না নিলে এই প্রবৃদ্ধি সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা যাবে না।

২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে দেশের পোশাক রপ্তানি ছিল ২৩৯ কোটি ডলার। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি নেমে আসে ৪৯ কোটি ডলারে, যা ছিল সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে অন্যতম নিম্নস্তর।

ব্যবসায়ীরা জানান, ঈদুল ফিতরের কারণে উৎপাদন ও শিপমেন্টে ধীরগতি ছিল। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ‘লিবারেশন ডে’ শুল্কনীতি ঘোষণার পর বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, যার ফলে অনেক ক্রেতা অর্ডার স্থগিত করেন। এর সঙ্গে ভারতের ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিলের সিদ্ধান্তও রপ্তানি কার্যক্রমে জটিলতা তৈরি করে। ফলে এপ্রিল ২০২৫ ছিল ব্যতিক্রমী একটি মাস।

যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা

যুক্তরাষ্ট্রের ‘রিসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ সংক্রান্ত আদালতের সাম্প্রতিক রায়ে কিছু নির্দিষ্ট পক্ষের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ শুল্ক স্থগিত করা হলেও বেশির ভাগ আমদানিকারকের ক্ষেত্রে এটি এখনো কার্যকর রয়েছে।

এর ফলে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের রপ্তানিকারকদের জন্য শুল্ক পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও মূল্য নির্ধারণে সতর্ক অবস্থান নিতে হচ্ছে।

পোশাক খাতের উদ্যোক্তা ও ট্যাড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশিকুর রহমান তুহিন বলেন, ‘বর্তমানে বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন দেশে সুরক্ষামূলক বাণিজ্যনীতি, অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ, জাহাজীকরণ ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যবসা পরিচালনাকে কঠিন করে তুলছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে তৈরি পোশাক খাতে।’

আশিকুর রহমান তুহিনের মতে, শুধু কম খরচে উৎপাদনের কৌশল দিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থাকা সম্ভব নয়। এখন উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদন, প্রযুক্তিনির্ভর কারখানা, দক্ষ মানবসম্পদ এবং দ্রুত সরবরাহ সক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে নতুন বাজার অনুসন্ধান ও বাণিজ্য কূটনীতি জোরদার করাও জরুরি।

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান রপ্তানি খাতের এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে বাস্তবভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘জ্বালানি নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিল্প-কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র দ্রুত পূর্ণ সক্ষমতায় চালু করতে হবে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।’

শুধু যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর নির্ভর না করে মধ্যপ্রাচ্য, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় নতুন বাজার সম্প্রসারণের আহবান জানান তিনি। একই সঙ্গে বন্দর সক্ষমতা বৃদ্ধি, লিড টাইম কমানো, কাস্টমস ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং ব্যাংকঋণের সুদহার সহনীয় পর্যায়ে আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সূত্র: কালের কণ্ঠ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights