যুদ্ধবিরতির জন্য কী কী শর্ত দিয়েছে ইরান?

অনলাইন ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান আলোচনায় দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শর্তের ওপর জোর দিচ্ছে ইরান। এর মধ্যে রয়েছে- দেশটির ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিদেশে আটকে থাকা বা জব্দ ইরানি সম্পদ মুক্ত করা এবং ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া।

ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে কাতার ও পাকিস্তান। তাদের সহায়তায় দুই দেশের মধ্যে আলোচনা এগিয়ে চলছে।

ইরানি কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, যেকোনও সম্ভাব্য সমঝোতা শুধু সাময়িক উত্তেজনা কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির ভিত্তি তৈরি করবে—এমন নিশ্চয়তা চায় তেহরান। এ কারণেই আলোচনায় নিজেদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত কয়েকটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিচ্ছে তারা।

নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারকে প্রধান শর্ত
ইরানের অন্যতম প্রধান দাবি হলো দেশটির ওপর আরোপিত মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। এসব নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপক চাপ তৈরি করেছে।

তেহরানের কর্মকর্তারা মনে করছেন, নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখে দীর্ঘমেয়াদি কোনও রাজনৈতিক সমঝোতা কার্যকর করা কঠিন হবে। তাই সম্ভাব্য চুক্তির অংশ হিসেবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে চাইছে ইরান।

ইরানের অর্থনীতি আগে থেকেই নানা সংকটে রয়েছে। নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, আর্থিক লেনদেন ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে আলোচনায় অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে তেহরান।

বিদেশে আটকে থাকা সম্পদ ফেরতের দাবি
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পাশাপাশি বিদেশে আটকে থাকা বা জব্দ ইরানি সম্পদ মুক্ত করার দাবিও জানিয়েছে ইরান।

বিভিন্ন দেশে ইরানের সম্পদ ও অর্থনৈতিক লেনদেনের ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রভাব রয়েছে। তেহরানের দাবি, দীর্ঘমেয়াদি কোনও সমঝোতার অংশ হিসেবে এসব সম্পদ ছাড় করার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

ইরানি কর্মকর্তারা মনে করছেন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক করতে এবং দেশের ওপর তৈরি হওয়া চাপ কমাতে এসব সম্পদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

নৌ অবরোধ নিয়েও তেহরানের আপত্তি
আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা নৌ অবরোধ। ইরানের কর্মকর্তারা বলছেন, এই অবরোধ প্রত্যাহার না হলে কোনও কার্যকর সমঝোতায় পৌঁছানো কঠিন হবে।
বিশেষ করে ইরানের তেল রফতানির ওপর এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে তেহরানের। দেশটির অর্থনীতির অন্যতম প্রধান আয়ের উৎস হলো তেল রফতানি। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে তেল বিক্রি ও রফতানি অব্যাহত রাখার সুযোগ ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, তেল রফতানির ওপর বাধা অব্যাহত থাকলে সম্ভাব্য কোনও শান্তিচুক্তির পরও দেশটির অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে। এ কারণে আলোচনার অংশ হিসেবে নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়টিকেও তারা গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে সামনে আনছেন।

দীর্ঘমেয়াদি শান্তির দিকে নজর
কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে আলোচনা চলছে, সেখানে তাৎক্ষণিক সংঘাত বন্ধের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।

ইরানের অবস্থান হলো, যেকোনও সমঝোতা এমন হতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে আবার একই ধরনের সংঘাত তৈরি না হয় এবং দেশটির অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হয়।

তবে এসব দাবি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কী হবে এবং আলোচনার মাধ্যমে উভয় পক্ষ কোনও সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

মধ্যস্থতাকারী কাতার ও পাকিস্তানের জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পরীক্ষা। কারণ নিষেধাজ্ঞা, ইরানের আটকে থাকা সম্পদ এবং তেল রফতানির ওপর বিধিনিষেধ—এই তিনটি বিষয়ই সম্ভাব্য সমঝোতার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার কোনও উদ্যোগে অর্থনৈতিক চাপ কমানো এবং দেশটির তেল রফতানির পথ স্বাভাবিক করার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। এখন আলোচনার পরবর্তী ধাপে যুক্তরাষ্ট্র এসব দাবির বিষয়ে কী অবস্থান নেয়, সেটিই হয়ে উঠতে পারে সমঝোতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সূত্র: আল-জাজিরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights