যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বিশ্বমন্দার শঙ্কা আইএমএফের
নিজস্ব প্রতিবেদক
ইরান যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হলে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করে সদস্য দেশগুলোর জন্য সতর্কতা জারি করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটি সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য অব্যাহত থাকে, তবে বিশ্ব অর্থনীতি ভয়াবহ মন্দার ঝুঁকিতে পড়বে।
ওয়াশিংটনে শুরু হওয়া বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন সভায় প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রতিবেদনে এ শঙ্কার কথা বলা হয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতিকে অত্যন্ত নাজুক উল্লেখ করে আইএমএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর তেল, গ্যাস ও খাদ্যপণ্যের দাম চড়া থাকবে, এমনকি আগামী বছরও একই অবস্থা থাকতে পারে। চলতি বছর বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশের নিচে নেমে যেতে পারে। এ পরিস্থিতিকে ১৯৮০ সালের পর পঞ্চম বৈশ্বিক মন্দার ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি, যার সর্বশেষ একটি রূপ দেখা যায় করোনা মহামারির সময়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। যুদ্ধের বর্তমান প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে ইতোমধ্যে ২০২৬ সালের জন্য বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে দিয়েছে সংস্থাটি। আইএমএফের অর্ধবার্ষিক হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, জ্বালানির আকাশচুম্বী দাম যদি ২০২৬ সালের মাঝামাঝিও নিয়ন্ত্রণে আসে, তবু জি-৭ ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে এ বছর যুক্তরাজ্যেই প্রবৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি কমবে এবং মূল্যস্ফীতি সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকবে। তবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে অর্থাৎ যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিলে ও জ্বালানির দাম অপরিবর্তিত থাকলে ১৯৮০ সালের পর পঞ্চমবারের মতো ভয়াবহ মন্দার মুখে পড়বে বিশ্ব অর্থনীতি। এ সতর্কবার্তার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া সমালোচনা করেছেন ব্রিটিশ চ্যান্সেলর র্যাচেল রিভস। আইএমএফের বৈঠকে যোগ দিতে ওয়াশিংটন যাওয়ার আগে তিনি বলেন, ‘ইরান যুদ্ধ আমাদের যুদ্ধ নয়, কিন্তু এর জন্য যুক্তরাজ্যকে চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে। আমি এই ব্যয় চাইনি, কিন্তু এখন আমাদের এর মোকাবিলা করতে হবে। র্যাচেল রিভস সরাসরি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দায়ী করে ‘দ্য মিরর’কে বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও যুদ্ধের ময়দান থেকে বেরিয়ে আসার পরিকল্পনা ছাড়াই কোনো সংঘাতে জড়ানোটা বোকামি। আমি অত্যন্ত হতাশ ও বাকরুদ্ধ যে যুক্তরাষ্ট্র কোনো এক্সিট প্ল্যান ছাড়াই এ যুদ্ধে জড়িয়েছে। এদিকে আইএমএফ জানিয়েছে, বিশ্বজুড়ে প্রবৃদ্ধি কমলেও জ্বালানি আমদানিকারক ও উন্নয়নশীল দেশগুলোই সবচেয়ে বড় ধাক্কা খাবে। মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের লক্ষ্য নিয়ে ট্রাম্পের স্ববিরোধী বক্তব্যের মধ্যেই ২০২৬ সালের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস শূন্য দশমিক ১ শতাংশ কমিয়ে ২.৩ শতাংশে নামিয়েছে সংস্থাটি। যুক্তরাজ্যের জন্য এই পূর্বাভাস আরও উদ্বেগজনক। দেশটির প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ কমিয়ে শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি সরকারি লক্ষ্যমাত্রা ২ শতাংশের দ্বিগুণ, অর্থাৎ ৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
আইএমএফের প্রধান অর্থনীতিবিদ পিয়েরে-অলিভিয়ের গৌরিনকাস সতর্ক করে বলেছেন, প্রতিদিন পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে এবং বিশ্ব অর্থনীতি একটি নেতিবাচক পরিণতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। যদি তেলের দাম ব্যারেল-প্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়ে ২০২৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়, তবে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশে নেমে আসবে, যাকে বিশ্বমন্দার সমতুল্য ধরা হয়। ১৯৮০ সালের পর এমন পরিস্থিতি কেবল চারবার দেখা গেছে, যার সর্বশেষটি ছিল ২০২০ সালের করোনা মহামারি ও ২০০৮ সালের আর্থিক মন্দার সময়। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি যুদ্ধ বন্ধের ওপর জোর দিয়েছে আইএমএফ। গৌরিনকাস বলেন, ঢালাও ভর্তুকি বা দাম বেঁধে দেওয়ার মতো জনপ্রিয় সিদ্ধান্তগুলো প্রায়ই অকার্যকর ও ব্যয়বহুল প্রমাণিত হয়। এর পরিবর্তে লক্ষ্যভিত্তিক ও অস্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো এ বছর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বড় ধরনের ধস বা সংকোচনের মুখে পড়তে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেছে আইএমএফ। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর ইরানের অর্থনীতি ৬ দশমিক ১ শতাংশ সংকুচিত হবে। তবে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হলে ২০২৭ সালে দেশটি ৩ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ফিরে পেতে পারে।
