যেভাবে ন্যাটোর কবর খুঁড়ছেন ট্রাম্প!

অনলাইন ডেস্ক

দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগ থেকেই বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সামরিক জোট ন্যাটো মিত্রদের প্রতি বিরূপ মনোভাব ছিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের। তাদের তুলনামূলক কম প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে ক্ষোভ থেকে শুরু করে ডেনমার্কের অধীনস্থ গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি, এসব কারণে দীর্ঘদিন ধরেই এই জোট অস্বস্তির মধ্যে রয়েছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের যুদ্ধে ন্যাটো মিত্রদের যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত জোটের ভাঙনকে নজিরবিহীন পর্যায়ে নিয়ে গেছে। চলতি সপ্তাহে ট্রাম্প এই সমর্থনের অভাবকে ন্যাটোর জন্য এক ‘কলঙ্ক’ হিসেবে অভিহিত করেন।

তিনি বলেন, এই কলঙ্ক ‘কখনও মুছে যাবে না’। এর কয়েক ঘণ্টা পরই জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিক মের্ৎস আরও স্পষ্ট ভাষায় বলেন, এই সংঘাত ‘ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্কের একটি কঠিন পরীক্ষা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি জোট থেকে বেরিয়ে যায়, তবে এই ট্রান্স-আটলান্টিক জোট টিকে থাকতে পারবে কি?

জার্মান ব্রডকাস্টার ডয়েচে ভেলের সঙ্গে আলাপে আটলান্টিক কাউন্সিলের বিশ্লেষক এলিজাবেথ ব্রক বলেন, “ট্রাম্প যতবার ন্যাটোকে অগুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বর্ণনা করেন, ততবারই এই জোট দুর্বল হয়। এর মানে জোটটি ভেঙে গেছে বা যাবে এমন নয়, তবে আক্ষেপের বিষয় জোটটি অত্যন্ত দুর্বল হয়ে গেছে।”

এদিকে সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির সিনিয়র ফেলো এবং ইউরোপ ও ন্যাটোর জন্য সাবেক ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অব ডিফেন্স জিম টাউনসেন্ড বলেন, “ন্যাটো আগের মতো স্বাভাবিক অবস্থায় আর ফিরবে না। আমরা এখন আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে বিচ্ছেদের কাছাকাছি অবস্থান করছি।”

দুই বিশ্লেষকের মতেই ট্রাম্পের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রকে ন্যাটো থেকে বের করা সম্ভব হবে না। কারণ ডেমোক্র্যাটরা তো এই সিদ্ধান্তের পক্ষে সায় দেবেই না, খোদ ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির একটা অংশও ন্যাটোর পক্ষে। তাই আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে ন্যাটো থেকে বের করতে হলে মার্কিন সিনেটে যে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে হবে বা কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হবে, তা পাওয়ার সম্ভাবনা কম।

তবে ট্রাম্পের সামনে বিকল্প উপায় রয়েছে। কোনও সদস্য দেশ আক্রমণের শিকার হলে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সাহায্য করার বাধ্যবাধকতা নেই। ন্যাটোর আর্টিকেল ৫-এ সম্মিলিত প্রতিরক্ষার কথা বলা হলেও তা স্বয়ংক্রিয় সামরিক প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করে না। ফলে ওয়াশিংটন আদৌ সাহায্যে এগিয়ে আসবে কি না, তা নিয়ে মিত্রদের মধ্যে সন্দেহ রয়েছে।

এছাড়া ইউরোপে অবস্থানরত প্রায় ৮৪ হাজার মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করাও সম্ভব। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধের সময় যেসব দেশ সহযোগিতা করেনি, সেসব দেশ থেকে মার্কিন ঘাঁটি সরিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছেন ট্রাম্প। এমনকি তিনি সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করে মিত্রদের সঙ্গে সামরিক সমন্বয়ও বন্ধ করতে পারেন।

ন্যাটো প্রতিষ্ঠার পর থেকে ইউরোপের নিরাপত্তার ভিত্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এ ধরনের বিচ্ছিন্নতা জোটের ওপর বড় ধরনের আঘাত হানতে পারে।

ইতালির সাবেক ন্যাটো রাষ্ট্রদূত স্টেফানো স্টেফানিনি আল-জাজিরাকে বলেন, “ন্যাটোকে দুর্বল করতে ট্রাম্পের জোট ছাড়ার দরকার নেই। তিনি শুধু এই সম্ভাবনার কথাই বলে এর বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করেছেন।”

ন্যাটো নিয়ে ট্রাম্পের বিষোদ্গারের ফলে রাশিয়া শক্তিশালী হচ্ছে বলে মনে করেন আটলান্টিক কাউন্সিলের এলিজাবেথ। তার ভাষায়, “ট্রাম্পের কথাবার্তার ফলে রাশিয়া শক্তিশালী হচ্ছে। ন্যাটো এক থাকলেই কেবল তা রাশিয়ার জন্য চিন্তার কারণ। কিন্তু রাশিয়া যখন এই জোটে বিভক্তি দেখছে, তখন সে এক বা একাধিক ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্রের ক্ষতি করার কথা ভাবতেই পারে।” সূত্র: আল-জাজিরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights