যেভাবে ব্যর্থ হয়েছে ট্রাম্পের চীন সফর: আল-জাজিরা

অনলাইন ডেস্ক

চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে প্রায় ৪০ ঘণ্টার সংক্ষিপ্ত সফর করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সফর থেকে তার ফেরার পরপরই স্পষ্ট হয়েছে যে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত নিরসনে কোনও কার্যকর অগ্রগতি অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠক। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠকে ইরান ইস্যুতে দীর্ঘ আলোচনা হলেও দুই পক্ষের অবস্থান আগের মতোই ভিন্ন রয়ে গেছে।

বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যৌথভাবে ইরানের ওপর হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এর জেরে অগ্নিগর্ভে পরিণত হয় গোটা মধ্যপ্রাচ্য। কেননা, ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনা ধ্বংস হয়ে যায়। এই সময় বাহরাইন, কুয়েত, সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে যুক্তরাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলা চালায় ইরান। একই সঙ্গে বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয় ইরান।

ওয়াশিংটন প্রশাসনের দাবি, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতেই এই অভিযান চালানো হয়েছে। তবে তেহরান বরাবরই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পরিকল্পনার কথা অস্বীকার করে আসছে।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ইরানে ৩ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে।

চীনের অবস্থান
বেইজিং বৈঠকের সময় চীন পুনরায় যুদ্ধের বিরোধিতা করে এবং দ্রুত শান্তি প্রতিষ্ঠার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, সংঘাত শুধু ইরান নয়, পুরো অঞ্চলের দেশগুলোর ওপর গুরুতর মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি সৃষ্টি করছে।

চীন আরও জানায়, তারা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান এবং উন্নয়নভিত্তিক সহযোগিতার ওপর জোর দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার একটি চার দফা পরিকল্পনা অনুসরণ করছে।

হরমুজ প্রণালী ইস্যু
যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউস জানায়, দুই দেশ একমত হয়েছে যে, হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত থাকতে হবে, যাতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকে।

এই প্রণালী বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও এলএনজি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ। যুদ্ধ শুরুর পর ইরান এই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করে এবং কিছু দেশের জাহাজের জন্য অনুমতি প্রক্রিয়া কঠিন করে তোলে।

চীন এ বিষয়ে সরাসরি ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়নি, যদিও বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল ও জ্বালানি বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাবের কথা স্বীকার করেছে।

পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে মতপার্থক্য
যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, দুই দেশ একমত যে, ইরান কখনওই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারবে না। তবে চীনের বিবৃতিতে এ বিষয়ে সরাসরি কোনও কঠোর অবস্থান উল্লেখ করা হয়নি। বরং তারা আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতার ওপর জোর দিয়েছে।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের কাছে বর্তমানে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ রয়েছে, যা পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

বৈঠকের ফলাফল
বিশ্লেষকদের মতে, শি জিনপিং ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ইরান ইস্যুতে দুই পক্ষের অবস্থান অপরিবর্তিতই রয়েছে। চীন তার আগের শান্তি পরিকল্পনায় অটল রয়েছে, আর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক কর্মকাণ্ড নিয়ে কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে।

ফলে প্রত্যাশিতভাবে চীনকে ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগে রাজি করানোর মার্কিন প্রচেষ্টা কোনও দৃশ্যমান সাফল্য অর্জন করতে পারেনি।

যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান
বৈঠকের আগে মার্কিন কর্মকর্তারা চীনের সহায়তা চেয়েছিলেন, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী নিয়ে উত্তেজনা প্রশমনে। তবে পরবর্তীতে ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা দাবি করেন, ওয়াশিংটন একাই পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা জানান, ইরান সংকট সমাধানে চীনের কিছু প্রভাব থাকলেও মূল নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতেই রয়েছে।

সুতরাং বলা যায়, শি-ট্রাম্প বৈঠক ইরান যুদ্ধ নিরসনে কোনও ফলপ্রসূ দিক নির্দেশনা দৃশ্যমান হয়নি। ব্যর্থ হয়েছে এই বৈঠক। দুই পরাশক্তির কৌশলগত ও রাজনৈতিক ভিন্নতার কারণে মধ্যপ্রাচ্য সংকট সমাধানে অনিশ্চয়তা আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সূত্র: আল-জাজিরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights