রণতরী না ডুবিয়েও যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে হারাতে পারে চীন

অনলাইন ডেস্ক

১৯৯৫-৯৬ সালের তাইওয়ান প্রণালীর সংকট বেইজিংয়ের সামরিক চিন্তাধারায় আমূল পরিবর্তন এনেছিল, যা আজ তিন দশক পর বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সেই সময়ে মার্কিন বিমানবাহী রণতরীগুলো তাইওয়ানের খুব কাছ দিয়ে অবাধে চলাচল করলেও চীন সেগুলোকে ট্র্যাক করা বা বাধা দেওয়ার মতো কোনো সক্ষমতাই রাখত না। আমেরিকার এই একতরফা আধিপত্য চীনের জন্য শুধু কূটনৈতিক পরাজয় নয় বরং একটি গভীর সামরিক অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

এই গ্লানি থেকে শিক্ষা নিয়ে পরবর্তী কয়েক দশক ধরে চীন তাদের সামরিক বাহিনীকে আধুনিকায়নের এক মহাপরিকল্পনা হাতে নেয়।

চীনের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল সমুদ্রের বিশাল জলরাশিতে মার্কিন রণতরীর অবস্থান নিখুঁতভাবে শনাক্ত করা। কারণ যে লক্ষ্যবস্তু খুঁজে পাওয়া যায় না তাকে আঘাত করা অসম্ভব। এই লক্ষ্য পূরণে তারা মহাকাশভিত্তিক নজরদারি উপগ্রহ, দূরপাল্লার ওভার-দ্য-হরাইজন রাডার এবং ড্রোন প্রযুক্তির এক বিশাল জাল বিছিয়ে দিয়েছে। বর্তমানে চীন কেবল মাঝেমধ্যে দেখার জন্য নয় বরং অবিচ্ছিন্নভাবে মার্কিন ফ্লিটগুলোর ওপর নজরদারি চালানোর সক্ষমতা অর্জন করেছে। এর ফলে মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য আগের মতো অতর্কিতে কোনো অপারেশন চালানো এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

রণকৌশলগতভাবে চীনের পরিকল্পনাকারীরা বুঝতে পেরেছিলেন যে কেবল প্রতিপক্ষের বিমান ধ্বংস করে লাভ নেই। যতক্ষণ মূল রণতরীটি সচল থাকবে ততক্ষণ সেখান থেকে নতুন বিমান উড়তে থাকবে। এই ভাবনা থেকেই বেইজিং তাদের বিনিয়োগের বড় অংশ ডাইভার্ট করে দূরপাল্লার জাহাজ-বিধ্বংসী ব্যালিস্টিক মিসাইল তৈরির পেছনে। বিশেষ করে ডিএফ-২১ডি মিসাইলের আবির্ভাব এই সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই মিসাইলগুলোর মূল উদ্দেশ্য রণতরীকে ডুবিয়ে দেওয়া নয় বরং সেগুলোকে চীনের উপকূল থেকে অনেক দূরে অবস্থান করতে বাধ্য করা।

একটি কার্যকর আক্রমণ পরিচালনার জন্য শুধু ক্ষেপণাস্ত্র থাকলেই চলে না বরং নজরদারি ও আঘাতের মধ্যে একটি শক্তিশালী সংযোগ বা কিল-চেইন প্রয়োজন। চীন গত কয়েক বছরে এমন এক সমন্বিত নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে যেখানে বিভিন্ন উৎস থেকে আসা তথ্য মুহূর্তের মধ্যে বিশ্লেষণ করে সরাসরি মিসাইল সিস্টেমে পৌঁছে দেওয়া হয়। এই ডিজিটাল ইন্টিগ্রেশনের ফলে রণতরী শনাক্ত করা এবং সেটিতে আঘাত করার মধ্যবর্তী সময় অনেক কমে এসেছে। এই দ্রুতগামী যোগাযোগ ব্যবস্থা মার্কিন নৌবাহিনীর রক্ষণাত্মক কৌশলের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

দূরত্ব বজায় রাখা এখন চীনের নৌ-প্রতিরক্ষার মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন সুপারক্যারিয়ারগুলো সাধারণত যুদ্ধের ময়দানের যত কাছে থাকে তত বেশি কার্যকর হয়। কিন্তু চীনের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের ভয়ে যদি এই বিশাল জাহাজগুলোকে কয়েকশ মাইল পিছিয়ে থাকতে হয় তবে তাদের কার্যকারিতা অর্ধেকের বেশি কমে যায়। এতে করে যুদ্ধবিমানগুলোর জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়া বা বারবার রিফুয়েলিং করার জটিলতা তৈরি হয় যা পরোক্ষভাবে মার্কিন বিমান শক্তির ধার কমিয়ে দেয়।

এই সামরিক প্রস্তুতির পেছনে একটি গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও কাজ করছে, যা ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। চীন যদি শুরুতেই কোনো একটি মার্কিন ক্যারিয়ারের বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে তবে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এর ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হবে। এই বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির ভয় মার্কিন নেতাদের যেকোনো সংকটে দ্রুত হস্তক্ষেপ করার আগে দুবার ভাবতে বাধ্য করে। অর্থাৎ যুদ্ধের ময়দানে নামার আগেই মনস্তাত্ত্বিকভাবে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করে দেওয়া চীনের এই কৌশলের অন্যতম বড় অর্জন।

গত ৩০ বছর ধরে চীন অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে তাদের এই অ্যান্টি-এক্সেস বা এরিয়া-ডেনায়াল সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে। তারা নিয়মিতভাবে বিশাল নৌবহরকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে সামরিক মহড়া দিচ্ছে এবং সাবমেরিন বহরকে আরও উন্নত করছে। আজকের দিনে চীনের কাছে অ্যান্টি-ক্যারিয়ার ওয়ারফেয়ার কেবল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নয় বরং এটি তাদের সামগ্রিক সামরিক দর্শনের একটি অবিচ্ছেদ্য স্তম্ভে পরিণত হয়েছে। প্রথম দ্বীপ শৃঙ্খলে মার্কিন শক্তির প্রবেশকে জটিল করাই এখন বেইজিংয়ের প্রধান রণকৌশল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights