রপ্তানির নতুন লক্ষ্য ৬৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার

বিশেষ প্রতিনিধি

চলতি অর্থবছরের জন্য পণ্য ও সেবা খাত মিলিয়ে ৬৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে পণ্য খাতে ৫৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার এবং সেবা খাতে আরও ৮ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

গত অর্থবছরের তুলনায় উভয় খাতে রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ১৫ শতাংশ। তবে রপ্তানি আয়ের নতুন এই লক্ষ্য অর্জনে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং গ্যাস ও জ্বালানি সংকটকে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরেছেন ব্যবসায়ীরা।

গতকাল বিকালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য রপ্তানির নতুন এ লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির।

নির্বাচিত সরকারের নীতিগত স্থিতিশীলতা, ব্যবসাবান্ধব সংস্কার, নতুন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতি ক্রেতাদের আস্থা বৃদ্ধির ফলে আগামী অর্থবছরে নির্ধারিত রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী।

প্রেস ব্রিফিংয়ের আগে তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রতিনিধিদের সঙ্গে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর প্রস্তাবিত লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে আলোচনা করেন। এ সময় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)-এর ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি ও ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠক সূত্র জানায়, গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানিতে ৫৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার লক্ষ্য ধরা হয়েছিল। এর বিপরীতে অর্থবছর শেষে প্রকৃত রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৪৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ০ দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। চলতি অর্থবছর সেই নেতিবাচক রপ্তানি আয়ের ওপর প্রায় ১৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে শুধু পণ্য রপ্তানিতে ৫৭ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা প্রস্তাব করেছিল ইপিবি। তবে ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ অব্যাহত থাকার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে।

এ পরিস্থিতিতে সারা বিশ্বে জ্বালানিসহ পণ্য সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এই অনিশ্চয়তার কারণেই পণ্য খাতে রপ্তানি আয়ের লক্ষ্য ইপিবির প্রস্তাবিত লক্ষ্যের চেয়ে ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্র জানায়, রপ্তানির নতুন লক্ষ্য ঘোষণার আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সভায় প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে ব্যবসায়ীরা চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি, গ্যাস ও জ্বালানি সংকটের কারণে কারখানা চালু করতে না পারা এবং মূলধনসংকটসহ নানা কারণে কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়গুলো তুলে ধরেন।

পরে জ্বালানি সংকট নিয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, এটি এখন বাস্তবতা। তিনি জানান, দেশে মাটির নিচ থেকে ৬ থেকে ৭ টিসিএফ গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। বিদেশ থেকে আরও ৯০০ থেকে ৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) জ্বালানি আমদানি হয়। সক্ষমতার অভাবে এ মুহূর্তে এর বেশি গ্যাস দেওয়া সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে জ্বালানি বিভাগের দুটি এলএনজি রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) রয়েছে। এ দুটি এফএসআরইউ দিয়ে এর বেশি এলএনজি আমদানি করা সম্ভব নয়। জ্বালানি মন্ত্রণালয় আরও দুটি এফএসআরইউ স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে এমন তথ্য দিয়ে মন্ত্রী বলেন, যত দ্রুত জ্বালানির সংস্থান করা যাবে তত দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

যুদ্ধ অনিশ্চয়তা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, দুটি যুদ্ধ চলছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চ্যালেঞ্জ মিলিয়ে সামগ্রিকভাবে যে পরিবেশ বিরাজ করছে তা থেকে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির আশঙ্কা আমরা করতে পারি। তবে এই অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও নির্বাচন পরবর্তী সরকারের আমলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত ঘুরে দাঁড়ানোর বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। মন্ত্রী বলেন, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, বিনিয়োগ সহজীকরণ এবং সরকারি সেবার প্রক্রিয়া সরলীকরণের মাধ্যমে রপ্তানিতে নতুন গতি আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রপ্তানি বহুমুখীকরণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮৫ শতাংশই তৈরি পোশাক খাতনির্ভর। এই নির্ভরতা কমাতে সরকার চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ফুটওয়্যার, শিপবিল্ডিং, শিপ রিসাইক্লিং, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এসব খাতের বিকাশে শিগগিরই সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানান তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ওপর কার্যকর শুল্ক কাঠামোয় বাস্তবিক অর্থে নতুন কোনো পরিবর্তন আসেনি। আগের ১০ শতাংশ শুল্কই নতুন আইনি কাঠামোর অধীনে বহাল রয়েছে। ফলে দেশের রপ্তানিতে নতুন করে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা নেই। এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করার বিষয়টি তুলে ধরে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, দক্ষিণ কোরিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) আলোচনা শেষ পর্যায়ে রয়েছে। পাশাপাশি আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে চলতি বছরের মধ্যেই এফটিএ সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গেও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শিগগিরই শুরু হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights