রম্য রচনা **** মোবাইল না থাকলে জীবন অচল হয়ে যায়……. ———-সুব্রত পাল

সকালের ঘুম ভাঙলেই প্রথম কাজটা কী? চোখ খুলে মায়ের মুখ দেখা? জানলার বাইরে পাখির ডাক শোনা? কিংবা খাট থেকে উঠে দাঁত ব্রাশ করা? না, না, এসব একদমই নয়। আসল কাজটা হলো—বিছানার পাশেই মোবাইলটা খুঁজে পাওয়া আর স্ক্রিন অন করে নোটিফিকেশন দেখা। ফেসবুক কতজন লাইক দিল, ইনস্টাগ্রামে কে নতুন ছবি পোস্ট করল, হোয়াটসঅ্যাপে কে রাত দুইটায় ‘গুড নাইট’ পাঠাল—এসবই বড় ব্যাপার।

কিন্তু সেই দিনটা একেবারেই অন্যরকম ছিল। মঙ্গলবার সকাল, হঠাৎ ঘুম ভাঙল, হাত বাড়িয়ে মোবাইল খুঁজলাম। এলোপাথাড়ি খাটের নিচে হাত ঢোকালাম, বালিশের তলায় হাত দিলাম, চাদরের ভাঁজ উল্টেপাল্টে দেখলাম—কোথাও নেই! মাথায় বাজ পড়ল যেন। মনে হলো, সূর্য উঠেছে ঠিকই, কিন্তু আমার ব্যক্তিগত গ্যালাক্সি সূর্য, মানে মোবাইলটা—ডুবে গেছে!

আমি তো হাঁ করে বসে আছি। বাড়ির সবাই অবাক। মা বললেন,
—”তুই তো মোবাইল ছাড়া জল ই খাস না, আজ কী হলো?”
আমি গম্ভীর মুখে উত্তর দিলাম,
—”মা, মোবাইলটা হারিয়ে গেছে।”
মা হেসে বললেন,
—”তা হলে আজ তোর আসল পরীক্ষা। অনেক দিন বলছিলাম, মোবাইল নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করিস না। আজ দেখ, প্রকৃতি তোকে জোর করে ছুটি দিয়েছে।”
বাবা পাশ থেকে যোগ করলেন,
—”এই হলো সেই দিন, যেদিন তোর আসল ‘ম্যানুয়াল মোড’-এ বেঁচে থাকার ক্ষমতা যাচাই হবে।”
আমি তখন মনে মনে বলছি, “বাবা, ম্যানুয়াল মোড তো ফোনের ক্যামেরায় চলে, জীবনে না!”
অফিস যাওয়ার ঝক্কি- সকালের খাওয়া সেরে চিন্তা করলাম, অফিসে যাই। এখন অফিসে যেতে গেলে গুগল ম্যাপ ছাড়া রাস্তা খুঁজে পাওয়া যায়? আগে মানুষ কেমন করে অফিস যেত, ভেবেই অবাক লাগে। আমি একসময় কলেজে পড়তাম, তখনও হাতে স্মার্টফোন ছিল না। কিন্তু সেদিন মনে হলো, আমি যেন আমাজন জঙ্গলের মধ্যে পথ হারানো এক পর্যটক।
রাস্তা জিজ্ঞেস করতে হল রিকশাওয়ালাকে। উনি বললেন,
—”বাবু, ওইদিক দিয়ে গেলে জ্যাম, এইদিকে গেলে শর্টকাট।” ওই মোড়দিকে গিয়ে কালীবাড়িটা ক্রস করে বাঁদিকে একটা ছোট গলি দিয়ে বেরিয়ে যান___
আমি বুঝতেই পারলাম না, কোনটা ফেক নিউজ আর কোনটা সত্যি খবর। গুগল ম্যাপ থাকলে অন্তত লাল আর সবুজ দাগ দেখে বুঝতে পারতাম কোন রাস্তা ফাঁকা।
অফিস পৌঁছাতে আধঘণ্টা দেরি হলো। সহকর্মীরা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল। একজন বলল,
—”তোমার মুখে আজ হাসি নেই, কি হয়েছে বলোতো, মোবাইল হারিয়েছো?”
আমি ফ্যাকাশে মুখে বললাম,
—”হ্যাঁ, আজ আমি ডিজিটাল ডিটক্সে আছি।”
তারা হেসে উঠল। এক সহকর্মী ফিসফিস করে বলল,
—”ডিজিটাল ডিটক্স মানে তো শখ করে কয়েক ঘণ্টার জন্য অ্যাপ বন্ধ করা। আরে ভাই, তুমি তো পুরো লাইফ সাপোর্টটাই খুলে ফেলেছো!”
দুপুরের খাওয়া-দাওয়া:লাঞ্চ ব্রেকে সবার অবস্থা দেখলাম। চারপাশে সবাই খাওয়ার সাথে সাথে মোবাইলে স্ক্রল করছে। কেউ খাবারের ছবি তুলে ফেসবুকে দিচ্ছে—লাঞ্চ উইথ কলিক্স । কেউ ইউটিউব শর্টস চালিয়ে ভাত গিলছে। আমি তখন খালি প্লেটের দিকে তাকিয়ে আছি। মনে হচ্ছিল, আমি যেন কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক মিউজিয়ামে বসে আছি—একজন প্রাচীন মানুষ, যাকে আধুনিক সভ্যতার মাঝে ফেলে রাখা হয়েছে।
অফিসের ক্যান্টিনের ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন,
—”স্যার, আজ কিচ্ছু ছবি তুললেন না খাবারের? প্রতিদিন তো বসে বসে অন্তত পাঁচটা শট নেন!”
আমি বিরক্ত মুখে বললাম,
—”আজ আমার ক্যামেরা ছুটিতে আছে।”
বিকেলের ঝামেলা-অফিস শেষে বাড়ি ফিরতে গিয়ে দেখি, বাসের টিকিট কাটার অ্যাপ তো নেই! কন্ডাক্টর বললেন,
—”ভাই, গুগল পে বা ফোনপে ছাড়া চলা যায় না এখন।”
আমি বললাম,
—”আমার কাছে ক্যাশ আছে।”
কন্ডাক্টর হাসলেন,
—”বাবু, ক্যাশও তো এখন ইতিহাস!” শেষ পর্যন্ত পাশের এক ভদ্রলোক দয়া করে নিজের মোবাইল দিয়ে টিকিট কাটলেন। আমি তাকে টাকা দিলাম হাতে। তিনি এমনভাবে তাকালেন, যেন আমি কোনো অ্যান্টার্কটিকা থেকে এসে পড়েছি।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে – বাড়ি পৌঁছেই আসল যন্ত্রণার শুরু। মোবাইল না থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ নেই। কেউ ফোন করছে, কেউ মেসেজ পাঠাচ্ছে—আমি কিছুই জানি না। সোশ্যাল মিডিয়ায় কে কী লিখল, কে কাকে ব্লক করল, কে কার সঙ্গে ছবি দিল—সব খবর আমার কাছে অন্ধকার।

বন্ধুরা নাকি গ্রুপে লিখেছে—”আজ বিশ্বজিৎ কোথায়? এত চুপ কেন?” আর আমি সেই সময়ে বসে আছি টিভির সামনে, পুরনো ধারাবাহিক দেখছি। সোশ্যাল মিডিয়া ছাড়া সন্ধ্যা কাটানো মানে যেন ছাতা ছাড়া বর্ষার দিনে বের হওয়া। চারদিক থেকে ভিজে যাচ্ছি, অথচ রক্ষা করার কিছু নেই।
রাতের ফাঁদ- রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে আবার ভয় লাগতে শুরু করল। মোবাইল ছাড়া ঘুম আসবে তো? কারণ আমি তো অভ্যস্ত ইউটিউব দেখে ঘুমাতে, কিংবা হোয়াটসঅ্যাপে রাত বারোটার ‘শুভ রাত্রি’ পড়তে। আজ এসব কিছুই নেই। আমি শুধু সিলিং ফ্যানের শব্দ শুনছি।
বিছানায় শুয়ে মনে হলো, আমি যেন কোনো অচেনা দেশে এসেছি—যেখানে সময় চলে, দিন-রাত আসে, মানুষ বাঁচে, কিন্তু মোবাইল নেই।
এক দিনের অভিজ্ঞতা-
পুরো দিনটা শেষে বুঝলাম, মোবাইল ছাড়া জীবন সত্যিই ভয়ঙ্কর। মানুষ হয়তো বলবে—”মোবাইল ছাড়া একটু সময় কাটানো ভালো, শান্তি পাওয়া যায়।” কিন্তু আমার মনে হলো, শান্তি নয়, বরং এক অদ্ভুত নিঃসঙ্গতা এসে ভর করল। যেন আমি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি।
একটা দিনই আমাকে শিক্ষা দিল—মোবাইল এখন শুধু একটা যন্ত্র নয়, এটা যেন আমাদের শরীরের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়। চোখ, কান, নাক, জিভ, ত্বকের পরেই ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়—মোবাইল।

তাই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আর কখনো মোবাইল ছাড়া ঘর থেকে বের হব না। বরং দুইটা মোবাইল রাখব—একটা হারালে আরেকটা থাকবে। আর যদি দুটোই হারিয়ে যায়? তখন হয়তো আবার নতুন করে এই ভয়ঙ্কর কল্পনার মুখোমুখি হতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights