রাখাইনে ত্রিমুখী সংঘর্ষ

হাসানুর রশীদ, কক্সবাজার

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপের আশপাশের এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) অবস্থানে বিমান হামলা জোরদার করেছে দেশটির সেনাবাহিনী। অন্যদিকে স্থলভাগে আরাকান আর্মির সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে সশস্ত্র তিনটি গোষ্ঠী। মর্টার শেল ও বোমার বিস্ফোরণে কেঁপে উঠছে সীমান্ত উপজেলা টেকনাফের ঘরবাড়ি। ওপার থেকে ছোড়া গুলি এসে পড়ছে এপারে লোকজনের ঘরবাড়ি, চিংড়ি ঘের ও নাফ নদে। গুলিতে আহত শিশুকে ভর্তি করা হয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। পালিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশকালে সশস্ত্র গ্রুপের ৫৩ সদস্যকে আটক করেছে যৌথ বাহিনী। এর মধ্যে অনেকে গুলিবিদ্ধ। তাদের টেকনাফ থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।

টেকনাফ সীমান্ত এলাকায় গুলিবিদ্ধ চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী হুজাইফা আফনানকে (৯) গুরুতর অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছে। আইসিইউ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশিদ বলেন, গুলি মেয়েটির মুখ দিয়ে ঢুকে ব্রেনে চলে গেছে। অবস্থা সংকটাপন্ন। তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে।

আফনান টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের তেচ্ছিব্রিজ গ্রামের জসিম উদ্দিনের মেয়ে ও তেচ্ছিব্রিজ হাজি মো. হোছাইন সরকারি প্রাথমিক স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। সকাল ১০টার দিকে উপজেলার হোয়াইক্যং এলাকায় গুলিবিদ্ধ হওয়া আফনান প্রথমে মারা যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষুব্ধ জনতা টেকনাফ-কক্সবাজার সড়ক অবরোধ করে।

সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও এপিবিএনের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

শিশুর চাচা শিক্ষক আলী আকবর সাজ্জাদ জানান, সকালে আফনান অন্য শিশুদের সঙ্গে উঠানে খেলা করার সময় আহত হয়।

সীমান্তের একাধিক সূত্র জানায়, হোয়াইক্যং সীমান্তের ওপারে রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির সঙ্গে সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান স্যালভেশন আর্মি (আরসা), আরাকান রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) এবং নবী হোসেন বাহিনীর মধ্যে গোলাগুলি ও থেমে থেমে সংঘর্ষ চলছে। অন্যদিকে মিয়ানমার জান্তা বাহিনীও আরাকান আর্মির অবস্থানে বিমান হামলা ও বোমা নিক্ষেপ করেছে।

শনিবার সন্ধ্যা থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত টেকনাফের হোয়াইক্যং সীমান্তের খুব কাছে রাখাইনে এ সংঘর্ষ হয়েছে। এ সময় বুলেট এসে পড়েছে সীমান্ত গ্রাম লম্বাবিলে। এ সময় বাড়িঘর কেঁপে ওঠে।

হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য সিরাজুল মোস্তফা লালু বলেন, গত তিন দিন হোয়াইক্যংয়ের ওপারে রাখাইন সীমান্তে দিনে-রাতে গোলাগুলি ও বোমা বিস্ফোরণ হচ্ছে। শনিবার সন্ধ্যা থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত শত শত রাউন্ড গুলি ও একের পর বোমা বিস্ফোরণের শব্দে এপারের বাসিন্দাদের স্বাভাবিক চলাফেরায় ব্যাঘাত ঘটছে। সেখান থেকে ছোড়া গুলি এপারে এসে পড়ছে। মানুষের চিংড়ি ঘের ও চাষের জমিতে গুলি এসে পড়ছে। এখনো গোলাগুলি ও বোমার বিস্ফোরণ হচ্ছে। এতে টেকনাফের হোয়াইক্যং সীমান্তে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) জানায়, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে আরাকান আর্মির সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশ সীমান্তে অনুপ্রবেশের সময় সশস্ত্র গোষ্ঠীর ৫৩ সদস্যকে আটক করা হয়েছে। পরে তাদের টেকনাফ থানায় হস্তান্তর করা হয়।

টেকনাফ মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘হোয়াইক্যং সীমান্তের ওপারে রাতভর গোলাগুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। এরই একপর্যায়ে মিয়ানমার থেকে আসা গুলিতে এক শিশু গুলিবিদ্ধ হয়।

উখিয়া-৬৪ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল জহিরুল ইসলাম বলেন, সীমান্তের ওপারে পরিস্থিতি এবং গোলাগুলির বিষয়টি নজরদারিতে রাখা হয়েছে। অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নাফ নদ ও সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। স্থানীয় রমজান উদ্দিন বলেন, ‘আজ সকালে হোয়াইক্যং তেচ্ছিব্রিজ এলাকায় বেড়িবাঁধে গেলে তিনি বেশ কিছু গুলি দেখতে পান। তখন ওপারে গোলাগুলি হচ্ছিল। এ সময় একটি গুলি এসে পড়ে তার পায়ের কাছে মাটিতে।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইমামুল হাফিজ নাদিম বলেন, সীমান্তের ওপারে গোলাগুলির ঘটনার বিষয়ে বিজিবিসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা করতে সতর্ক করা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights