রাজনগরে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকায় স্বজনপ্রীতির অভিযোগ
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সরকারি সহায়তার তালিকা প্রণয়নে ব্যাপক অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক ও বর্গাচাষিদের বাদ দিয়ে বোরো আবাদ না করা এবং বন্যায় ফসলের ক্ষতি না হওয়া ব্যক্তিদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ করেছেন হাওরপাড়ের কৃষকেরা।
এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁও ইউনিয়নের ৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
কৃষকদের অভিযোগ, স্থানীয় ইউপি সদস্য, চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্ট উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের যোগসাজশে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের বাদ দিয়ে পছন্দের ব্যক্তি ও স্বজনদের নাম ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে সরকারি সহায়তা পাওয়ার কথা থাকলেও বন্যায় সর্বস্ব হারানো প্রান্তিক ও বর্গাচাষিরা এখন সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
অভিযোগকারীরা বলেন, তালিকা তৈরির আগে মাঠপর্যায়ে সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করা হলে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বাদ পড়ার সুযোগ ছিল না। কিন্তু তালিকা তৈরিতে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা না থাকায় সরকারি সহায়তার প্রকৃত সুফলভোগীরা বঞ্চিত হয়েছেন।
রাজনগরের পাঁচগাঁও ইউনিয়নের হাওরপাড়ের কৃষকদের জীবিকার প্রধান অবলম্বন কাউয়াদিঘী হাওরের এক ফসলি বোরো ধান। বছরের একটি মাত্র ফসলের ওপর নির্ভর করেই চলে তাঁদের সংসার। চলতি বোরো মৌসুমে অতিবৃষ্টি ও বন্যার পানিতে হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকার ধান তলিয়ে যায়। অনেক কৃষক পানির কারণে ধান কাটতেও পারেননি। এতে তাদের বছরের একমাত্র আয়ের উৎস হারিয়ে গেছে।
কৃষকেরা জানান, ধান নষ্ট হওয়ার পর অনেক পরিবারে খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে। চারদিকে বন্যার পানি থাকায় দিনমজুরি ও কুলির কাজও কমে গেছে। ফলে একদিকে ফসলহানি, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের সংকট মিলে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন তারা।
কাউয়াদিঘী হাওরপাড়ের বর্গাচাষি আলামিন, দুরূদ মিয়া, গিয়াস মিয়াসহ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা বলেন, ‘আমরা দিনমজুর। অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করে ধান উৎপাদন করি। এ বছর বন্যার পানিতে আমাদের ধান তলিয়ে গেছে। ধান কাটতে পারিনি। এখন ঘরে খাবার নেই। চারদিকে পানি থাকায় দিনমজুরির কাজও পাচ্ছি না। ছেলে-মেয়েদের নিয়ে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছে। অথচ যারা বোরো আবাদ করেনি কিংবা যাদের ধানের কোনো ক্ষতি হয়নি, তাদের অনেকে সরকারি সহায়তা পেয়েছে।’
প্রান্তিক কৃষক নয়ন মিয়া, আকদ্দছ আলীসহ স্থানীয় কৃষকেরা বলেন, ‘হাওরে এক ফসলি বোরো ধানই আমাদের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন। বন্যায় সেই ধান নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর আমরা নিঃস্ব হয়ে পড়েছি। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সরকারের দেওয়া সহায়তার তালিকায় আমাদের নাম নেই। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের স্বজনপ্রীতির কারণে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা বাদ পড়েছেন।’
কৃষকদের অভিযোগ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হলেও তালিকা তৈরির প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ছিল না। মাঠপর্যায়ে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি যাচাই না করে তালিকা প্রস্তুত করায় বঞ্চিত হয়েছেন প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা।
তালিকায় এমন ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যারা চলতি মৌসুমে বোরো আবাদই করেননি। আবার যাঁদের বোরো ধান বন্যার পানিতে নষ্ট হয়নি, তাঁদের নামও তালিকায় রয়েছে বলে অভিযোগ কৃষকদের।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে পাঁচগাঁও ইউপি চেয়ারম্যান জুবের আহমদ বলেন, তালিকায় কিছু ভুল হয়ে থাকতে পারে। ইউএনও সহ আমরা তালিকা করেছি। বেশি কৃষক আবেদন করায় সবাইকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। তবে অনেক কৃষক বাদ পড়েছেন তালিকা থেকে। যে-সব কৃষক বাদ পড়েছেন তাদের জন্য আরও ৬ টন চাল বরাদ্দ হয়েছে। এগুলো তাদের মধ্যে দেওয়া হবে।
পাঁচগাও ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বাহার উদ্দিন বলেন, আমি ১৪০০ কৃষকের নামের তালিকা পাঠিয়েছি উপজেলায় ও ইউনিয়ন পরিষদে সেখানে নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তার জন্য সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা মাঠপর্যায়ে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন না হলে এর সুফল প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে পৌঁছাবে না। তাঁরা বলেন, সরকারি সহায়তা নিয়ে কোনো ধরনের দলীয় প্রভাব, স্বজনপ্রীতি বা পক্ষপাতিত্বের সুযোগ থাকা উচিত নয়। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের বাদ দিয়ে তালিকা তৈরি করা হলে সরকারের মহতী উদ্যোগই প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
এ বিষয়ে রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিপুল সরকার বলেন, ‘বরাদ্দ কম থাকায় সবাইকে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’
