রানু বেগমের মাথা গোঁজার শেষ সম্বলটুকুও বন্যায় ধসে পড়েছে, সাহায্যের আকুতি

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি।

হবিগঞ্জের সাম্প্রতিক বন্যা কেড়ে নিয়েছে স্বামীহারা রানু বেগমের শেষ সম্বলটুকুও। বন্যার তীব্র স্রোতে মুহূর্তেই ধসে পড়েছে তার মাথা গোঁজার একমাত্র কুঁড়েঘর। সর্বস্ব হারিয়ে এখন অসুস্থ ছেলে, বৃদ্ধ মা ও কিশোরী মেয়েকে নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি তিনি। দুবেলা দুমুঠো খাবার জোগাড় করতেই যেখানে হিমশিম খেতে হচ্ছে, সেখানে নতুন করে ঘর নির্মাণের কথা ভাবাও যেন বিলাসিতা।

হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের হাতিরথান গ্রামের বাসিন্দা রানু বেগমের ঘরটি গত শুক্রবার রাতে বন্যার পানির তীব্র স্রোতে ধসে পড়ে। বর্তমানে পাশের একটি বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি ও তার পরিবার।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চার সদস্যের সংসারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি রানুর কিশোরী মেয়ে। পড়াশোনা ছেড়ে একটি কোম্পানিতে কাজ করে যে সামান্য আয় করেন, তা দিয়েই কোনোরকমে চলে সংসার ও অসুস্থ সদস্যদের ওষুধের খরচ। রানু বেগমও মানুষের বাড়িতে কাজ করেন। এতদিন টানাপোড়েনের মধ্যেও সংসার চলছিল। কিন্তু মাথার ওপরের শেষ টিনের চালাটুকু হারিয়ে পরিবারটি এখন চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে।

গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়ে রানু বেগম বলেন, আমার ছেলেটা তিন বছর ধরে অসুস্থ। কোমরের হাড়ের সমস্যায় সে বিছানায় পড়ে আছে। আমার বৃদ্ধ মাও অসুস্থ। মেয়েটা স্কুল ছেড়ে কোম্পানিতে কাজ করছে, তার সামান্য আয়ে সংসার চলে। এই ঘরটাই ছিল আমাদের শেষ সম্বল। বন্যার পানিতে সেটাও ধসে গেছে। এখন কী খাব, কোথায় থাকব, কীভাবে চলব—কিছুই বুঝতে পারছি না। সরকার যদি একটু সহযোগিতা করত, তাহলে হয়তো বেঁচে থাকার একটা পথ পেতাম।

শুধু রানু বেগম নন, একই এলাকার সেলিনা বেগমের অবস্থাও একই রকম। বন্যার পানিতে ধসে পড়েছে তারও একমাত্র বসতঘর। স্বামীহারা এই নারী চার কন্যাসন্তানকে নিয়ে এখন খোলা আকাশের নিচে জীবনযাপনের শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। নতুন করে কোথায় আশ্রয় গড়বেন, কীভাবে সন্তানদের নিয়ে জীবন শুরু করবেন—সেই দুশ্চিন্তাই এখন তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।

সরেজমিনে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, রানু ও সেলিনার মতো আরও অনেক পরিবার একই দুর্দশায় দিন কাটাচ্ছে। কোথাও বন্যার স্রোতে ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে, কোথাও পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়েছে আসবাবপত্র, খাদ্যসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। পানি নেমে গেলেও রয়ে গেছে কাদা, ধ্বংসস্তূপ আর অনিশ্চয়তা।

গত বৃহস্পতিবার রাতে খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের অন্তত ৩৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়। এতে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন।

ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, বন্যার প্রথম তিন দিন অনেকেই না খেয়ে বা অর্ধাহারে কাটিয়েছেন। এখনও অনেক এলাকায় সরকারি ত্রাণ সহায়তা পৌঁছেনি বলে দাবি তাদের।

এ বিষয়ে হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. জিএম সরফরাজ বলেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ নিরূপণের কাজ এখনও শুরু হয়নি। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুত করে সরকারিভাবে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights