রাশিয়ার হামলায় গুদাম ছাই, কিয়েভে বাড়ছে খাদ্য সংকট
অনলাইন ডেস্ক
রাশিয়া একের পর এক খাদ্য গুদাম ও রসদ সরবরাহ চেইনে হামলা চালানোয় ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে তৈরি হয়েছে তীব্র খাদ্য সংকট। সুপারমার্কেটগুলোর তাকগুলো এখন ফাঁকা পড়ে আছে এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
স্থানীয় একটি সুপারমার্কেটে কেনাকাটা করতে আসা ৬৮ বছর বয়সী পেনশনভোগী ভ্যালেন্টিনা নিজের উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, রাশিয়া ইউক্রেনীয়দের জীবনকে অসহনীয় ও অসম্ভব করে তুলতে চায় এবং তারা এতে সফলও হচ্ছে। ৬৮ বছর বয়সী এই বৃদ্ধা জানান, স্বল্প জমানো টাকায় তাকে চলতে হয়, কিন্তু ইদানীং সসেজসহ প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অনেক বেড়ে গেছে।
ইউক্রেনের প্রধান শহরগুলোর চারপাশে রসদ ও খাদ্য গুদামে সাম্প্রতিক সময়ে আক্রমণ জোরদার করেছে মস্কো। কিয়েভের ওপর এই হামলা ছিল সবচেয়ে তীব্র। সাময়িক এক যুদ্ধবিরতি শেষে গত সোমবার রাতে ড্রেন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ফের রাজধানী কিয়েভে তোলপাড় সৃষ্টি করে রুশ বাহিনী, যাতে প্রাণ হারান দুইজন।
নোভুস সুপারমার্কেটে বাজারে আসা ৪০ বছর বয়সী দারিয়া মালিউকোভা খালি তাকের দিকে তাকিয়ে বলেন, পরিস্থিতি ভীতিকর হলেও তিনি শহর ছেড়ে কোথাও যাবেন না। ইউক্রেনের কৃষি নীতি ও খাদ্যমন্ত্রী তারাস ভিসোৎস্কি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, অবকাঠামোতে হামলার কারণে খাদ্যপণ্যের দাম ২.৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। তবে ইউক্রেনের বিলাসবহুল ব্র্যান্ড গুডওয়াইনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা দ্মিত্রো ক্রিমস্কি মনে করেন, এই দাম বৃদ্ধির পরিমাণ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
গত ১ সেপ্টেম্বর কিয়েভের কাছে ক্রিমস্কির একটি গুদামে হামলা চালিয়ে প্রায় ৪০ লাখ ইউরোর পণ্য ধ্বংস করে দেওয়া হয়। তিনি জানান, পণ্যের ঘাটতির চেয়ে রসদ সরবরাহ ব্যবস্থা পুনর্গঠন করতেই খরচ বেশি হবে, যা শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে প্রভাব ফেলবে। গুদাম সুরক্ষিত রাখতে তিনি এখন পোল্যান্ডের মতো প্রতিবেশী দেশে গুদাম স্থানান্তর কিংবা একাধিক ছোট সাইটে মজুদ ভাগ করার পরিকল্পনা করছেন। তিনি আরও জানান, তাদের কর্মচারীরা বিমান হামলার কারণে দিনে মাত্র ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা কাজ করতে পারছেন।
আগস্টের শেষ দিক থেকে নিয়মিত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কেবল খাদ্য গুদামই নয়, বরং ই-কমার্স লজিস্টিক হাব এবং আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার মানবিক সাহায্যের ওষুধ গুদামও ধ্বংস হয়েছে। বায়োকন নামে একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির তিন মাসের ওষুধের পুরো মজুদ এই হামলায় ছাই হয়ে গেছে এবং তাদের সব কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে।
তবে চার বছরের যুদ্ধে অভিজ্ঞ ইউক্রেনীয়দের মাঝে আগের মতো আতঙ্কে অতিরিক্ত কেনাকাটা করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে না। ব্রোভারির একটি এটিবি সুপারমার্কেটে আসা ৫৪ বছর বয়সী ইরিনা মেসিয়ানঝিনোভা বলেন, পচনশীল জিনিসপত্র বেশি কিনে রেখে লাভ নেই, সেগুলো পচে যাবে। তিনি ভবিষ্যতের কথা না ভেবে শুধু আজকের দিনটি পার করার চেষ্টা করছেন।
খাদ্যমন্ত্রী তারাস ভিসোৎস্কি দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছেন যে, এটিবি, সিলপো ও ফোরা-র মতো শীর্ষস্থানীয় প্রতিটি সুপারমার্কেট চেইনের লজিস্টিক কেন্দ্রগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, এটি যুদ্ধের শুরু থেকে এ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় আক্রমণ। ২০২২ সালে তারা যদি কৃষি রফতানি অবকাঠামো এবং পরবর্তী বছরগুলোতে জ্বালানি খাতকে টার্গেট করে থাকে, তবে ২০২৬ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরের আক্রমণগুলো সরাসরি সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার ওপর একটি সুপরিকল্পিত আঘাত।
এতো প্রতিকূলতার মধ্যেও আশা হারাচ্ছেন না স্থানীয় অধিবাসীরা। কিয়েভের কেন্দ্রীয় কৃষক বাজারে কেনাকাটা করতে আসা ৩৬ বছর বয়সী ট্রাভেল ম্যানেজার ওলেনা জুক বলেন, যুদ্ধের পর থেকে তারা এ ধরনের অনেক ঘটনার মুখোমুখি হয়েছেন। তবে যে পরিস্থিতিই আসুক না কেন, তারা বেঁচে থাকবেন এবং না খেয়ে মরবেন না।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
