রূপগঞ্জে রফিক বাহিনীর ত্রাসের রাজত্ব ; *ঘরছাড়াঅসংখ্য পরিবার, দিনে-দুপুরে বাড়িঘরেহামলা, নির্ঘুম রাত কাটছে নারী-শিশুদের
নিজস্বপ্রতিবেদক
আতঙ্কেরজনপদে পরিণত হয়েছে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলা। জমি দখল করতেদিনে-দুপুরে বাড়ি ঘরে হামলাচালানো হচ্ছে। বাড়িতে ঢুকে ভাঙচুর ওলুটপাট করা হচ্ছে মালামাল।রাতের বেলা বাড়ি বাড়িগিয়ে যুবতী মেয়েদের তুলে নিয়ে যাবারহুমকি দেওয়া হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে নির্ঘুমরাত পার করছেন অসংখ্যপরিবার। অনেকে পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি ফেলে এলাকা ছেড়েপালিয়ে গেছেন। অভিযোগের তীর রূপগঞ্জের কায়েতপাড়াইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও রংধনু গ্রুপেরসত্ত্বাধিকারী রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে।
১৫-২০ জন ভুক্তভোগী গত শনিবার অভিযোগ নিয়ে আমাদের অফিসে হাজির হন। তাদের অভিযোগ, রফিকুল ইসলাম তার নিজ এলাকা কায়েতপাড়া ইউনিয়নের সকল জমি দখল করতে সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে বাড়ি বাড়ি হামলা চালাচ্ছে। গত এক মাসেই অন্তত ৪০টি বাড়িতে হামলা ও লুটপাত চালিয়েছে। দিনে দুপুরে শত শত মানুষ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালাচ্ছে। অজ্ঞাত কারণে নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে পুলিশ। মামলাও নিচ্ছে না।
অভিযোগেরসূত্র ধরে শনিবার সরেজমিনরূপগঞ্জের কায়েতপাড়া ইউনিয়নের নাওড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়থমথমে পরিস্থিতি। দাঁড়িয়ে আছে একের পরএক আধভাঙা ভবন। ঠিক যেনইসরায়েলের ক্ষেপনাস্ত্র হামলায় বিধ্বস্থ হয়েছে বাড়িঘরগুলো। হামলার শিকার সাবেক ইউপি মেম্বার ওকায়েতপাড়া ইউনিয়ন যুবলীগের সেক্রেটারি মোশারফ ভুঁইয়ার বাড়িও। ভেঙে ফেলা হয়েছেদ্বিতল বাড়িটির গেট, জানালার কাঁচ।বাড়ির ভেতরে তিনটি বিল্ডিংয়েই ভাঙচুর করা হয়েছে। ঘরেঢুকে দেখা যায় বাথরুমেরকমোড থেকে শুরু করেআলমারি, টেবিল, চেয়ার সব ভাঙাচোরা। মোশারফভুঁইয়ার মামাতো ভাইয়ের স্ত্রী নার্গিস ভাঙা ঘরবাড়ি দেখাতেদেখাতে বলেন, অনেক দিন ধরেইরফিক (ওরফে আন্ডা রফিক) বাড়িটাছেড়ে দিতে বলছিল। রাজিনা হওয়ায় ১৫ দিন আগেতার ভাড়া করা দেড়-দুইশ লোক অস্ত্রশস্ত্রনিয়ে হাজির হয়। বড় বড়হাতুড়ি দিয়ে পুরো বাড়িভাঙচুর করে। টিভি, ফ্রিজসহসব নিয়ে গেছে। ভয়েআমরা সবাই পালিয়ে যাই।এরপর কয়েকবার এসে নানারকম হুমকিদিয়ে গেছে। পুরুষ মানুষরা বাড়িছাড়া। সাত-আটজন মেয়েআছে এই বাড়িতে। তাদেরনিয়ে সব সময় আতঙ্কেথাকি। পত্রিকায় এই সাক্ষাৎকার দেওয়ারপর আমার কি হবেজানি না।
কাছাকাছিদূরত্বে আরও কয়েকটি ভাঙাবিল্ডিং দেখা যায়। তাতেছিল না জনমানব। এছাড়াঅনেকগুলো মাটির বাড়ি পরিত্যাক্ত অবস্থায়পড়ে থাকতে দেখা গেছে। এবিষয়ে স্থানীয় লোকজনের অধিকাংশই ভয়ে মুখ খুলতেনারাজ। তবে আড়ালে ডেকেনাম প্রকাশ না করার শর্তেদুই নারী বলেন, আশপাশেরফিকের লোকজন আছে। রফিকের ভয়েএসব ঘরের লোকজন বাড়িঘরফেলে পালিয়েছে। এলাকা ছেড়েছে আজিজুল্লা, ফজুল, মোক্তার, আমারত, ছোমেদ আলী, কবিরসহ ৬০-৭০টি পরিবার। দুদিনআগে পরে আমাদেরও হয়তোএলাকা ছাড়তে হবে। গভীর রাতেঘরে ঢুকে রফিকের লোকজনহুমকি দিয়ে যায়। মারধরকরে।
মোশারফেরভাই আলী আসগর বলেন, নামমাত্র মূল্যে ঘরবাড়ি কিনে নিতে সাবেকইউপি চেয়ারম্যান ও রংধনু গ্রুপেরসত্ত্বাধিকারী রফিক সন্ত্রাসী বাহিনীদিয়ে অনেক দিন ধরেহামলা-মামলা চালিয়ে যাচ্ছে। আমাদের পুরো পরিবার আওয়ামীলীগ করে। আমার বাবাওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি, আমি ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। আমাদের পাঁচ ভাইয়ের বাড়িসহওই এলাকার অন্তত ৪০টি বাড়ি রফিকেরলোকজন ভেঙে ফেলেছে। প্রতিটাপরিবারই বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক। আজ সকালে দেড়-দুইশ লোক নিয়েগিয়ে আমার নতুন বাড়িটিভেঙেছে। ছোট ভাই শাহাজাদারবাড়ি ভেঙেছে কিছুদিন আগে। ভেকু দিয়েস্থানীয় হোসেন মেম্বারের তিন তলা বাড়িভেঙে ফেলেছে। স্থানীয় এমপি এবং বস্ত্রও পাট মন্ত্রী গোলামদস্তগীর গাজীর সমর্থন থাকায় সে এগুলো করারসুযোগ পাচ্ছে। তিনিই বিএনপি সমর্থক রফিককে আওয়ামী লীগের পতাকা দিয়েছেন। এখন জমি দখলেএকে অন্যকে সহযোগিতা করছেন।
পশ্চিমগাওকায়েতপাড়ার বাসিন্দা ও রূপগঞ্জ উপজেলাআওয়ামী লীগের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি খন্দকার আবুল বাশার টুকুবলেন, গত ২৪ অক্টোবরও ১৩ নভেম্বর দুইদফা আমার বাড়িতে লুটপাটহয়েছে। জোর করে গরু, ছাগল, টিভি, ফ্রিজ সব নিয়ে গেছে।তিন মিনিট হাঁটা দূরত্বে পুলিশ ফাঁড়ি। কেউ আসেনি। থানায়গেলে পুলিশ মামলা নেয়নি। পরে আদালতে গিয়েমামলা করি। বিষয়টি দলেরসিনিয়র নেতাদের জানিয়েছি।
এদিকেমোশারফ ভুঁইয়া বলেন, তার পাঁচ ভাইয়েরবাড়িঘরে হামলায় অন্তত ৮-১০ কোটিটাকার ক্ষতি হয়েছে। একটি ক্লাব ছিল, যেখানে দলীয় সভা-সমাবেশকরতাম। সেটা একদম গুড়িয়েদিয়েছে। গত এক মাসেঅন্তত ৪০টির বেশি বাড়িতে হামলাচালিয়েছে রফিক বাহিনী। থানামামলা নেয়নি। বাধ্য হয়ে আদালতে গিয়েপাঁচটি মামলা করেছি।
বাড়ি-ঘর ভাঙচুরের বিষয়েজানতে রূপগঞ্জ থানার ওসিকে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনিরিসিভি করেননি। নারায়ণগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার গোলাম মোস্তফা রাসেল বলেন, অতি সম্প্রতি বাড়িঘরভাঙার কোনো অভিযোগ পাইনি।তবে কিছুদিন আগে একটি বাড়িভাঙচুরের অভিযোগ পেয়েছি। তবে মামলা করারজন্য ভুক্তভোগী পরিবার আসেনি। আমরা সেটা তদন্তকরে দেখছি।
