লাগামহীন ওষুধের দাম

জয়শ্রী ভাদুড়ী

রোগীর চিকিৎসা খরচের সবচেয়ে বড় অংশ ব্যয় হয় ওষুধের পেছনে। অথচ জীবন রক্ষাকারী ওষুধের দাম নিয়ে চলছে নয়ছয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা এবং মূল্য নির্ধারণ নীতিমালা বাতিল করায় তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। জনগণের কথা বিবেচনা না করে ওষুধশিল্প মালিকদের খুশি করতে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

হঠাৎ কেন সরগরম ওষুধের বাজার : ৩ আগস্ট মন্ত্রিসভা ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা-২০২৬’ এবং ‘ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি-২০২৬’ বাতিলের প্রস্তাব অনুমোদন করে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ওষুধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩ অনুযায়ী অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রণয়নের আগে জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের পরামর্শ নেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রণীত তালিকার ক্ষেত্রে তা করা হয়নি। ২০২৬ সালের তালিকা বাতিল হলেও ১৯৯৪ সালের আদেশে প্রণীত অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা এবং সেসব ওষুধের সরকারি মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা আপাতত বহাল থাকবে। একই সঙ্গে নতুনভাবে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

কী বলছে সরকার : গত ১০ আগস্ট অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও দাম নির্ধারণ সংক্রান্ত পাঁচটি আলাদা কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে, ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় নতুন তালিকা প্রণয়ন ও দাম পুনর্নির্ধারণ করা হবে সে বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ২০২৩ সালের নতুন আইনের আলোকে কমিটিগুলো ইতোমধ্যে চূড়ান্ত করা হয়েছে। এ কার্যক্রমের মূল ফোকাল পয়েন্ট হলেন মন্ত্রীপরিষদ সচিব। নতুন কোনো তালিকা বা স্ট্র্যাটেজিক কৌশল নির্ধারণের বিষয়টি উপদেষ্টা কমিটির প্রথম সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

ছয় মাসে বেড়েছে যেসব ওষুধের দাম : রাজধানীর ফার্মেসিগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ছয় মাসে বেড়েছে বেশ কিছু ওষুধের দাম। এর মধ্যে প্রোবায়োটিক কম্পিনেশন, ফোর বিলিয়ন ২৫ টাকা থেকে ৩০ টাকা হয়েছে। প্রোবায়োটিক কম্পিনেশন, বিশ বিলিয়ন ৩০ টাকা থেকে ৪০ টাকা হয়েছে। জিনকো বিলোবা ১২০ এমজি ১৫ টাকা থেকে ২০ টাকা হয়েছে। জিনকো বিলোবা ৬০ এমজি ৩ টাকা বেড়ে ১৫ টাকা হয়েছে। আনডিনেচার্ড টাইপ টু কোলাজেন ৪০ মিলিগ্রাম ২৫ টাকা থেকে ৩০ টাকা হয়েছে। টাডালাফিল ১০ মিলিগ্রাম ৩৫ টাকা ছিল এক টাকা বেড়েছে। ফেক্সোফেনাডিন হাইড্রোক্লোরাইড ১৮০ মিলিগ্রাম ২ টাকা বেড়ে ১২ টাকা হয়েছে। ফেক্সোফেনাডিন হাইড্রোক্লোরাইড ১২০ মিলিগ্রাম ১ টাকা বেড়ে ৯ টাকা হয়েছে।

ভোগান্তিতে মানুষ : স্ট্রোকজনিত কারণে শরীরের ডান পাশ অচল হয়ে গেছে সাঈদ হোসেনের (৪২)। এর সঙ্গে রয়েছে উচ্চ রক্তচাপ এবং হরমোনের সমস্যা। রাজধানীর ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালে ফলোআপের জন্য এসেছিলেন তিনি। তার স্ত্রী ফাহমিদা খাতুন বলেন, গত বছর স্ট্রোকের পর থেকে সাঈদ দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী ছিলেন। তার উচ্চ রক্তচাপসহ বেশ কিছু জটিলতা রয়েছে। তার ওষুধের জন্য শুরুতে মাসে ৪-৫ হাজার টাকা খরচ হতো। বর্তমানে দাম বাড়ায় এখন মাসে প্রায় ৬-৭ হাজার টাকা খরচ হয়। এত খরচের কারণে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া আমার জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, একজন রোগীকে চিকিৎসা নিতে নিজ পকেট থেকে ব্যয় করতে হচ্ছে ৬৮ দশমিক ৫০ ভাগ টাকা। রোগীকে সবচেয়ে বেশি ৬৪ ভাগ টাকা ব্যয় করতে হয় ওষুধ খাতে। বাংলাদেশ কেমিস্টস অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির সাবেক পরিচালক জাকির হোসেন রনি বলেন, ‘ওষুধের দাম বাড়লে মানুষ চিকিৎসা বঞ্চিত হবে। ওষুধের বাজার লাগামহীন হওয়া জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। তাই সরকারকে দাম নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে তৎপর হতে হবে।’

যা বললেন বিশেষজ্ঞরা : জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলেন, ‘যে অজুহাতে অন্তর্বর্তী সরকারের তৈরি করা অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা বাতিল করা হয়েছে, তা অত্যন্ত ঠুনকো। সরকার চাইলে ওষুধ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করেই তালিকায় প্রয়োজনীয় সংযোজন বা বিয়োজন করতে পারত। কিন্তু তা না করে হঠাৎ ৩২ বছর আগের পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ায় নানা সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। এতে স্পষ্টতই সাধারণ জনগণের স্বার্থকে উপেক্ষা করে ওষুধ কোম্পানিগুলোর সুবিধাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার তালিকা তৈরির সময় উপদেষ্টা পরিষদের মতামত নেয়নি, এমন অভিযোগ তুলে যদি বর্তমান সরকার পুরো সিদ্ধান্ত বাতিল করে, তবে সেই ভুল শুধরে নেওয়ার সুযোগ তো বর্তমান সরকারের কাছেই ছিল। তারা চাইলেই উপদেষ্টা পরিষদকে সঙ্গে নিয়ে নতুন করে পুরো তালিকা পর্যালোচনা করতে পারত।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. সুফিয়ান নাহিন শিমুল বলেন, ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি বাতিলের সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব সাধারণ ভোক্তাদের ওপরে পড়বে। ভোক্তা ও ওষুধশিল্প উভয়ের স্বার্থ রক্ষা করে কীভাবে ওষুধের যৌক্তিক দাম ঠিক রাখা যায়, সে ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ও তদারকি সক্ষমতা সরকারের ঘাটতি রয়েছে। ফলে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের সুবিধাজনক উপায়ে দাম নির্ধারণ করে থাকে। সময় ও চাহিদার কথা ভেবে অন্তর্বর্তী সরকার যখন অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা সম্প্রসারণ করে ২৯৭টিতে উন্নীত করেছিল, ঠিক তখনই ওষুধশিল্পের মালিকরা এর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেন।’

কী ছিল ১৯৮২ সালের জাতীয় ওষুধ নীতিতে : ওষুধের বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ১৯৮২ সালের জাতীয় ওষুধ নীতি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ইতিহাসে একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হয়। আট সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠিত হয়েছিল; কমিটির সদস্য ছিলেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ সহজলভ্য করা, দাম কমানো এবং দেশীয় ওষুধশিল্পকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে এর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ছিল। নীতির অন্যতম বড় পরিবর্তন ছিল ১৫০টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা তৈরি করা। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ওষুধে জেনেরিক নাম ব্যবহারে গুরুত্ব দেওয়া এবং অপরিহার্য ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণ ছিল নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ঔষধ শিল্প সমিতি যা জানাল : বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির সাবেক মহাসচিব এবং ডেল্টা ফার্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকির হোসেন বলেন, ‘সরকার এখন আইন অনুযায়ী বৈধ পথে এগোতে চাচ্ছে। লক্ষ্য এমন একটি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা এবং ওষুধের মূল্য নির্ধারণ নীতিমালা তৈরি করা, যা আগামী ৩০-৪০ বছর কোনো ভুল বোঝাবুঝি ছাড়াই কার্যকর থাকবে। যাতে তালিকা নিয়ে বারবার বসতে না হয়।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights