শাক-সবজি-ভাতে পিছিয়ে রংপুরের মানুষ, বেশি খাচ্ছেন মাংস

নজরুল মৃধা, রংপুর

রংপুর বিভাগের মানুষ প্রয়োজনের তুলনায় কম শাক-সবজি ও ভাত খাচ্ছেন। একই সঙ্গে দুধ গ্রহণেও পিছিয়ে রয়েছেন তারা। তবে মাংস খাওয়ার ক্ষেত্রে চাহিদার চেয়েও বেশি গ্রহণ করছেন এ অঞ্চলের মানুষ। কৃষি ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য বলছে, খাদ্য উৎপাদনে সমৃদ্ধ অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণে ভারসাম্যহীনতা দেখা যাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে পুষ্টিঘাটতির ঝুঁকি তৈরি করছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আলু ও শাক-সবজি উৎপাদনে দেশের অন্যতম শীর্ষ অঞ্চল রংপুর বিভাগ। তবুও স্থানীয় মানুষের খাদ্যতালিকায় এসব পুষ্টিকর খাদ্যের উপস্থিতি প্রয়োজনের তুলনায় কম। অন্যদিকে গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি ও মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে মাংস গ্রহণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

রংপুর বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ অঞ্চলে প্রায় দেড় কোটি মানুষের বসবাস। একজন মানুষের দৈনিক আদর্শ মাংস গ্রহণের পরিমাণ ১২০ গ্রাম হলেও রংপুরের মানুষ গড়ে ১৮০ গ্রাম মাংস গ্রহণ করছেন, যা চাহিদার তুলনায় ৬০ গ্রাম বেশি।

অন্যদিকে একজন মানুষের দৈনিক ২৫০ গ্রাম দুধ গ্রহণের প্রয়োজন হলেও রংপুরে গড়ে দুধ গ্রহণ করা হচ্ছে ১৮০ গ্রাম। কয়েক বছর আগেও এ হার ছিল ১৫০ গ্রামের নিচে। ফলে দুধ উৎপাদন বাড়লেও এখনো চাহিদা পুরোপুরি পূরণ হয়নি।

চালের ক্ষেত্রেও ঘাটতি রয়েছে। একজন মানুষের দৈনিক ৪০০ গ্রাম চাল বা ভাত গ্রহণের প্রয়োজন হলেও রংপুর অঞ্চলে গড়ে গ্রহণ করা হচ্ছে ৩৮০ গ্রাম। নিম্নআয়ের মানুষের ক্ষেত্রে এ পরিমাণ আরও কম, যা অনেক ক্ষেত্রে ২৫০ গ্রামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

একইভাবে একজন মানুষের দৈনিক ৩০০ গ্রাম শাক-সবজি খাওয়ার প্রয়োজন হলেও বাস্তবে গ্রহণ করা হচ্ছে প্রায় ২৫০ গ্রাম। গমের ক্ষেত্রে দৈনিক প্রয়োজন ৫০ গ্রাম হলেও খাওয়া হচ্ছে মাত্র ২২ গ্রাম। তবে মাছ গ্রহণের ক্ষেত্রে চাহিদার তুলনায় কিছুটা বেশি খাওয়া হচ্ছে। যেখানে দৈনিক ৬০ গ্রাম মাছের প্রয়োজন, সেখানে গ্রহণ করা হচ্ছে প্রায় ৬৭ গ্রাম।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত দুই বছরে রংপুর বিভাগে গবাদিপশুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বর্তমানে কোরবানির পশুর চাহিদা মিটিয়ে প্রতিবছর প্রায় সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় লাখ পশু উদ্বৃত্ত থাকছে। পাশাপাশি পোল্ট্রি খাতেও ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে। চাহিদার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হাঁস-মুরগি উৎপাদিত হচ্ছে এবং উদ্বৃত্ত উৎপাদন দেশের অন্যান্য অঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে।

প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, রংপুর বিভাগের মোট মাংসের চাহিদার প্রায় ৩৫ শতাংশ পূরণ হচ্ছে হাঁস-মুরগি থেকে, ৪০ শতাংশ গরুর মাংস থেকে এবং অবশিষ্ট ২৫ শতাংশ আসছে খাসি, ছাগল ও ভেড়া থেকে।

রংপুর বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বিভাগীয় পরিচালক ডা. মোহাম্মদ আব্দুল হাই সরকার বলেন, রংপুর বিভাগের মানুষ গড়ে চাহিদার তুলনায় বেশি মাংস গ্রহণ করছেন। দুধের উৎপাদনও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। আশা করছি, আগামী দুই-এক বছরের মধ্যে দুধের ঘাটতি অনেকটাই পূরণ হবে।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্য উৎপাদনে উদ্বৃত্ত থাকা সত্ত্বেও পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণে অনীহার পেছনে অর্থনৈতিক ও অভ্যাসগত—দুই ধরনের কারণ রয়েছে। তাদের মতে, শাক-সবজি ও ফলমূল নিয়মিত খাদ্যতালিকায় না থাকলে পুষ্টির ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, পালং শাক, লালশাক, কলমিশাক, কচুশাক, ডাটাশাক, শসা, টমেটো, গাজর, ফুলকপি, বাঁধাকপি, শিম, করলা, বেগুন ও পটলের মতো শাক-সবজিতে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন, খনিজ ও আঁশ, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশ ফলিত পুষ্টি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (বারটান) পীরগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধান ও ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. ছাদেকুল ইসলাম বলেন, শাক-সবজি, চাল ও কিছু প্রয়োজনীয় খাদ্য গ্রহণে ঘাটতি থাকায় এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে পুষ্টিসংক্রান্ত কিছু সমস্যা দেখা দিচ্ছে। সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights