শিকারে পটু শঙ্খচিল

নজরুল মৃধা, রংপুর

মুক্ত আকাশে ডানা মেলে অনায়াসে ভেসে বেড়ায় শঙ্খচিল। শিকারের মুহূর্তে তার দৃষ্টি থাকে অবিচল, লক্ষ্য স্থির করে সুযোগের অপেক্ষা, আর ঠিক সময়েই নিখুঁত ঝাঁপ। এই শিকারি দক্ষতাই শঙ্খচিলকে আলাদা করেছে প্রকৃতির অন্য পাখিদের ভিড় থেকে। কবি-সাহিত্যিকদের কলমেও বারবার ফিরে এসেছে শঙ্খচিলের এ সৌন্দর্য ও তীক্ষèতা। একসময় গ্রামবাংলার আকাশে জোড়ায় জোড়ায় উড়তে দেখা গেলেও এখন আগের মতো চোখে পড়ে না এ পাখি। শঙ্খচিল অ্যাক্সিপিট্রিডি (Accipitridae) পরিবারের সদস্য। শঙ্খচিল (Brahminy Kite) বাংলাদেশে অতি পরিচিত একটি পাখি। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত উপমহাদেশজুড়ে, অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় এর বিস্তৃতি রয়েছে। শঙ্খচিলের বৈজ্ঞানিক নাম Haliastur indus। গড়ে শঙ্খচিলের দৈর্ঘ্য ৭৬ থেকে ৮৪ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। জীবিত মাছ ও বিভিন্ন জলজ প্রাণী এদের প্রধান খাদ্য। এ ছাড়া ছোট সাপ, হাঁস-মুরগির বাচ্চাও এদের প্রিয় খাবারের তালিকায় রয়েছে। ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত শঙ্খচিলের প্রজনন ঋতু। দক্ষিণ-পূর্ব অস্ট্রেলিয়ায় আগস্ট থেকে অক্টোবর এবং পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত এদের প্রজননকাল।

শঙ্খচিল সাধারণত উঁচু স্থানে বাসা বাঁধে। ছোট ডালপালা ও শুকনো পাতা দিয়ে তৈরি এ বাসা তারা বছরের পর বছর ব্যবহার করে। স্ত্রী শঙ্খচিল সাধারণত দুটি ডিম পাড়ে। ডিমে তা দেওয়ার কাজটি মূলত স্ত্রী পাখিই করে, তবে বাচ্চা বড় করার দায়িত্ব বাবা-মা দুজনেই ভাগ করে নেয়। ২৬ থেকে ২৯ দিনের মধ্যে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়।

এ পাখির ডানায় লালচে সর-রং, বাদামি ও কালোর মিশেল দেখা যায়। দেহের নিচের দিকে থাকে অসংখ্য রেখা। লেজ ও ডানার দৈর্ঘ্য প্রায় সমান। নদীনালা ও জলাশয়ের আশপাশে শঙ্খচিল বেশি দেখা যায়। গ্রামাঞ্চলে সাধারণত জোড়ায় জোড়ায় থাকলেও বড় জলাশয়ের ধারে ও সুন্দরবনে এরা ঝাঁকে ঝাঁকে বসবাস করে। সুযোগ পেলে জেলে নৌকা বা ট্রলার অনুসরণ করতেও দেখা যায়। ডানা মেলে শূন্যে ভেসে থেকে নিখুঁতভাবে শিকার ধরার এ দক্ষতাই শঙ্খচিলকে করেছে প্রকৃতির এক অনন্য শিল্পী। কবি জীবনানন্দ দাশের ‘আবার আসিব ফিরে’ সনেটে শঙ্খচিলের নাম আজও পাঠকের কাছে স্মরণীয়। ২০১৬ সালে ভারতে ‘শঙ্খচিল’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়, যা পরিচালনা করেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত নির্মাতা গৌতম ঘোষ। শঙ্খচিলকে কেন্দ্র করে আরও বহু সাহিত্যকর্ম রচিত হয়েছে। সম্প্রতি সুন্দরবন থেকে শঙ্খচিলের একটি দুর্লভ ছবি তুলেছেন ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার, কবি ও সাহিত্যিক রানা মাসুদ। তিনি বলেন, ছবি তোলার সময় মনে হয়েছিল পাখিটি যেন টার্গেট লক করে শিকারের জন্য চূড়ান্ত ড্রাইভ দিচ্ছে। ‘জীবনও ঠিক এমনই,’ বলেন তিনি, ‘আগে লক্ষ্য ঠিক করতে হয়, তার পর সেই লক্ষ্য অনুযায়ী নিরন্তর চেষ্টা। কিছু ছবি তোলার পর ভিতরে যে আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে, এ ছবিটিও ঠিক তেমনই এক অনুভূতি।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights