শিল্পবর্জ্যে বেহাল মেঘনা শীতলক্ষ্যা
সঞ্জিত সাহা, নরসিংদী
কলকারখানার বিষাক্ত কেমিক্যাল বর্জ্যে মারাত্মক দূষণের শিকার হচ্ছে নরসিংদীর মেঘনা, শীতলক্ষ্যাসহ এর বিভিন্ন শাখা নদী। এতে একদিকে যেমন নদীগুলোর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে, অন্যদিকে তীরবর্তী মানুষের জীবনযাত্রা ও পরিবেশ পড়েছে ঝুঁকিতে। স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে এসব নদী রক্ষায় জোরালো দাবি জানিয়ে আসছে।
মেঘনা ও শীতলক্ষ্যা নদী বেষ্টিত নরসিংদী জেলার জীবনজীবিকা অনেকটা নির্ভরশীল এর শাখা নদীগুলোর ওপর। আড়িয়াল খাঁ, হাঁড়িধায়া, পাহাড়িয়া ও পুরাতন ব্রহ্মপুত্রসহ বিভিন্ন নদনদী ঘিরে গড়ে উঠেছে জেলার শিল্পাঞ্চল। তবে শিল্পায়নের এই অগ্রযাত্রাই এখন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে পরিবেশ ও জনজীবনের জন্য। এক সময় এসব নদীপথে চলাচল করত বড় বড় জাহাজ ও পালতোলা নৌকা। কিন্তু শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর অপরিকল্পিত বর্জ্য নিঃসরণে দিনদিন সংকুচিত হয়েছে নদীগুলো। বর্তমানে বছরের বেশির ভাগ সময়ই পানির স্বল্পতায় নৌচলাচল প্রায় বন্ধ থাকে। কিছু কিছু শাখা নদী এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে। নাব্য রক্ষায় বিগত সময়ে প্রায় ২৩২ কিলোমিটার নদী পুনঃখনন করা হলেও দূষণ বন্ধ না হওয়ায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। সরাসরি নদীতে কেমিক্যাল মিশ্রিত বর্জ্য ফেলায় পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। ফলে মাছসহ জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। নদী বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের তথ্যমতে, দেশের সবচেয়ে দূষিত নদীগুলোর তালিকায় হাঁড়িধায়া নদীর অবস্থান দ্বিতীয়। এ নদীর পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা মাত্র ০.৬ মিলিগ্রাম/লিটার এবং ক্ষারতার মাত্রা ৪.১, যা জলজ প্রাণীর জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দূষণের কারণে হাঁড়িধায়া নদীতে এখন মাছ পাওয়া যায় না। গবাদিপশুর জন্যও এই পানি ব্যবহার অনুপযোগী
হয়ে পড়েছে। পানিতে নামলেই দেখা দিচ্ছে খোস-পাঁচড়া, চর্মসহ নানা ধরনের রোগ।
হাঁড়িধায়ার পর খরস্রোতা শীতলক্ষ্যাও দূষণের কবলে পড়েছে। একসময় নদীতে বোয়াল, রুই, কাতলা, চিতল, পাঙাশ ও কাঁচকিসহ নানা প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে শীত মৌসুমে কাপাসিয়া থেকে ঘোড়াশাল পর্যন্ত নদীতে মাছ মরে ভেসে ওঠার ঘটনা ঘটছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর জীববৈচিত্য রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় নরসিংদীর নদনদী ও জনজীবন আরও বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। নরসিংদী পরিবেশ আন্দোলনের (আপন) সাধারণ সম্পাদক প্রলয় জামান বলেন, কিছু কলকারখানার বিষাক্ত গ্যাস ও বর্জ্যরে কারণে প্রতি বছর মাছ মারা যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে এবং দেশে মাছের সংকট দেখা দিতে পারে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের নরসিংদী জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক বদরুল হুদা জানান, নদীর পানি দূষণ ও মাছ মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ণয়ে কাজ চলছে। দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিষয়টি নদী রক্ষা কমিশনের সভায় উপস্থাপন করা হবে।
