শিল্প নিয়ে সংকটে রাজশাহী

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী
রাজশাহীর বিসিক শিল্পনগরীর উদ্যোক্তা হাফিজুর রহমান। তিনি ২০০২ সালে ২৪ কোটি টাকায় এমএইচ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেড নামে কোম্পানি গড়ে তোলেন। মিনারেল ওয়াটার, বিস্কুট, জুস, লজেন্স, ম্যাংগো বার উৎপাদনের জন্য করা হয়েছিল কারখানাটি। কিন্তু ২০১৪ সালে আবেদন করে টাকা জমা দিয়েও গ্যাস সংযোগ পাননি। হাফিজুর রহমান জানান, পণ্য উৎপাদনের জন্য গ্যাস সংযোগ না পেয়ে সিলিন্ডার গ্যাস কিনে কারখানাটি কোনোরকম চালু রাখা হয়েছে। সংযোগ পেলে তাঁর মাসে বিল আসত ৩০ হাজার টাকা। সিলিন্ডার গ্যাস কিনে উৎপাদন করতে মাসে গ্যাস বিল আসছে ৩ লাখ টাকা। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। লোকসান দিয়ে কোম্পানি টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে। উৎপাদনের যে পরিমাণ লক্ষ্যমাত্রা ছিল, তা পূরণ হচ্ছে না।

একই অবস্থা রাজশাহীর অন্য শিল্পোদ্যোক্তাদের। গ্যাস সংযোগ ও পণ্য রপ্তানির সহজ যোগাযোগব্যবস্থা না থাকায় কোনোভাবেই এগোতে পারছে না রাজশাহীর শিল্প। উত্তরাঞ্চলের শহর রাজশাহীর শিল্পকারখানাগুলো গড়ে উঠেছে রাজশাহী বিসিক শিল্প এলাকায়। কিন্তু ২০১৪ সালের পর থেকে বিসিকের কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়নি। এর আগে ৩৫০টি শিল্পকারখানার মধ্যে ১৮টিতে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়েছিল। অনেক উদ্যোক্তা গ্যাস চেয়ে তখন থেকেই আবেদনসহ সার্বিক প্রক্রিয়া শেষ করেও গ্যাস পাননি। ফলে তাদের উচ্চমূল্যে সিলিন্ডার কিনে উৎপাদন চালিয়ে যেতে হচ্ছে। এতে ব্যয় বেড়ে লোকসানে পড়ছেন অনেকেই। আবার গ্যাস না পেয়ে রাজশাহী বিসিকের অনেক উদ্যোক্তা লোকসান দিয়ে কোম্পানি বন্ধ করে ফেলেছেন। যেগুলো টিকে আছে, সেগুলোর অবস্থাও ‘মুমূর্ষু’। বিসিকের এডভেন্ট বিডি কোম্পানির মালিক মোখলেছুর রহমান মুসা তাঁর কোম্পানিতে ম্যাংগো বার তৈরি করেন। তিনি বলেন, ‘গ্যাস সংযোগ থাকলে আমার প্রতি মাসে খরচ হতো ১০ হাজার টাকা। এখন সিলিন্ডার কিনে খরচ হয় ৫০ হাজার টাকা।’

রাজশাহী বিসিকের উপমহাব্যবস্থাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বিসিক-২ হচ্ছে রাজশাহীতে। সেখানে সব শিল্পকারখানায় গ্যাস সংযোগ থাকবে। বিসিক-১ অনেক পুরোনো, ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত। এখানেও গ্যাস থাকার কথা। আমরা গ্যাস কোম্পানির কাছে লিখব যেন বিসিক-১-এ গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়।’ এ বিষয়ে পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানির রাজশাহী আঞ্চলিক অফিসের ব্যবস্থাপক বরকত হোসেন মোল্লা বলেন, ২০১৪ সাল থেকে সরকারি সিদ্ধান্তে গ্যাস সংযোগ দেওয়া বন্ধ আছে। তবে ২০১৮ সাল থেকে বিসিকের শিল্পকারখানায় আবারও গ্যাস সংযোগ দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এরপর বিসিকের স্টার ঢালাই কারখানা নামে প্রতিষ্ঠানে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়েছে।

রাজশাহীর ব্যবসায়ীরা মনে করেন, গ্যাস সংযোগের বাইরে আরও একটি বড় সমস্যা তাঁরা মোকাবিলা করছেন। তা হলো, দেশবিদেশে পণ্য রপ্তানির জন্য সহজ কোনো ব্যবস্থা নেই। রাজশাহীতে নদী বা সমুদ্রবন্দর নেই। পণ্য পরিবহনে কোনো কার্গো বিমানও নেই। এ ছাড়া চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা বন্দরের সঙ্গে সরাসরি ট্রেন যোগাযোগ নেই। নদী, রেল ও আকাশপথ কোনোটারই ব্যবস্থা না থাকায় শিল্পগুলো সতেজ হতে পারছে না।

রাজশাহী রেশম শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি লিয়াকত আলী বলেন, ‘শিল্প বাঁচাতে হলে নদী, রেল এবং আকাশপথে পণ্য রপ্তানির সহজ যোগাযোগ সৃষ্টি করতে হবে। রাজশাহীতে পদ্মা নদী আছে। এখানে ড্রেজিং করে একটি নৌবন্দর করা যেতে পারে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম, মোংলা, পায়রা বন্দরের সঙ্গে রাজশাহী থেকে সরাসরি ট্রেন যোগাযোগ চালু করতে হবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights