শিশুর একা একা খেলা কি আসলেই চিন্তার বিষয়, কি বলছে গবেষণা?

অনলাইন ডেস্ক

সন্তানকে খেলার মাঠে বা স্কুলের বিরতির সময়ে একা একা খেলতে দেখলে অনেক অভিভাবকই দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। ভাবেন, শিশুটি হয়তো সবার সাথে মিশতে পারছে না, বন্ধুহীনতায় ভুগছে কিংবা তাকে জোর করে বন্ধুদের দলে টেনে নেওয়া দরকার। তবে সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় গবেষকরা জানিয়েছেন, একা খেলাধুলা করা মানেই শিশুটি সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া বা কোনো বিপদে থাকা নয়। অনেক শিশু স্বভাবগতভাবেই নিজেদের সঙ্গ বেশি উপভোগ করে এবং একা সময় কাটাতে পছন্দ করে।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইউনিভার্সিটি অব জর্জিয়া’র গবেষকদের পরিচালিত এই সমীক্ষায় দেখা গেছে, যেসব শিশু নিজেদের ইচ্ছেতেই একা খেলাধুলা করতে পছন্দ করে, তারা বন্ধুবান্ধব এবং সহপাঠীদের সাথে তাদের সম্পর্কের বিষয়ে যথেষ্ট সন্তুষ্ট থাকে। গবেষকরা স্পষ্ট করেছেন, শিশু কতটুকু সময় একা কাটাচ্ছে তা মূল বিষয় নয় বরং দলের প্রতি এবং বন্ধুদের প্রতি তার আপনত্বের অনুভূতি আছে কি না সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৯ থেকে ১১ বছর বয়সী প্রায় ৪৭৩ জন শিক্ষার্থীর ওপর এই বিস্তৃত গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়। গবেষণায় শিশুদের কাছে জানতে চাওয়া হয়, তাদের শ্রেণিকক্ষের কোন কোন সহপাঠী অন্যদের সাথে ভালো সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও একা থাকতে বা খেলতে পছন্দ করে। একই সাথে সামাজিক সম্পর্কের গুরুত্ব এবং বন্ধুদের সাথে নিজেদের অবস্থান নিয়ে তারা কতটা সন্তুষ্ট, সে বিষয়েও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

গবেষণালব্ধ তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক আচরণের দুটি বড় তফাত খুঁজে পেয়েছেন। একদলের শিশুরা একা থাকতে ভালোবাসলেও সামাজিক মেলবন্ধন এবং বন্ধুত্বের গুরুত্ব অনুভব করে। তারা নিজেদের মতো খেলতে পছন্দ করলেও মাঝে মাঝে বন্ধুদের আমন্ত্রণে সাড়া দেয়। ফলে তারা দলের অংশ হিসেবেও নিজেদের বজায় রাখতে পারে এবং একা থেকে আনন্দও পায়।

গবেষণার প্রধান লেখক এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী র‍্যাচেল ফানজ জানান, এই ধরনের শিশুরা একা সময় কাটাতে পছন্দ করলেও অন্যদের সাথে মিলেমিশে চলার চমৎকার দক্ষতা রাখে। তারা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী একাকীত্ব উপভোগ করার পাশাপাশি সহপাঠীদের সাথে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখতে সক্ষম হয়।

তবে অপর দলের শিশুরা সামাজিক মেলামেশা বা বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখাকে খুব একটা গুরুত্ব দেয় না। গবেষণায় দেখা গেছে, এই মনোভাবের শিশুরা দীর্ঘমেয়াদে সহপাঠীদের সাথে দূরত্ব তৈরি করে ফেলে। ক্রমাগত অন্যদের খেলার প্রস্তাব বা আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দেওয়ার ফলে একপর্যায়ে সহপাঠীরাও তাদের ডাকা বন্ধ করে দেয়, যা পরবর্তীতে তাদের সত্যি সত্যিই সমাজবিচ্ছিন্ন ও একাকী করে তোলে।

শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও গবেষণার সহ-লেখক মিশেল লিস এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন, শরীরের যত্ন নিতে যেমন শারীরিক চর্চার প্রয়োজন, তেমনি মনস্তাত্ত্বিক সুস্থতার জন্য সামাজিক মেলামেশাও জরুরি। প্রতিনিয়ত সামাজিক নিমন্ত্রণ বা যোগাযোগ এড়িয়ে চললে তা সম্পর্কের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

গবেষকরা অভিভাবকদের পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, যেসব শিশু একা খেলতে ভালোবাসে, তাদের জোর করে বড় কোনো দলে বা খেলার মাঠে ঠেলে দেওয়া উচিত নয়। এতে শিশুটি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত বোধ করতে পারে। বরং তাদের সমমনা ছোট কোনো দলের সাথে ধীরে ধীরে মেলামেশার সুযোগ করে দেওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বন্ধুত্বের এই গতিপ্রকৃতিগুলো বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তাই এই সময়ে অভিভাবক ও শিক্ষকদের বিশেষ সহানুভূতিশীল ও সচেতন দৃষ্টিভঙ্গি রাখা প্রয়োজন।

সূত্র: ইউরো নিউজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights