শিশু কন্যাটিকে একা রেখে চলে গেলেন সবাই

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি

ভারতের কলকাতার হোটেলে ভয়াবহ আগুনে কুষ্টিয়ার স্থানীয় দৈনিকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক দেবাশীষ দত্ত, তাঁর স্ত্রী আফসানা শারমীন, তিন বছর বয়সি সন্তান স্বর্ণ শিষ দত্ত, শ্বশুরসহ পরিবারের চারজন নিহত হয়েছেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরা হলো না সাংবাদিক দেবাশীষসহ পরিবারের চারজনের।

সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত শহরের আড়ুয়াপাড়া এলাকার ১৯/১, বাহাদুর আলী বিশ্বাস সড়কের তিন তলা বাড়ির দ্বিতীয় তলায় ভাড়া থাকতেন। দেবাশীষ দত্ত চ্যানেল নাইন ও দৈনিক আজকের পত্রিকার কুষ্টিয়া প্রতিনিধি ছিলেন। এ ছাড়া দেবাশীষের শ্বশুর নিহত আকরাম আলী শহরের থানাপাড়া এলাকার মরহুম বদরুদ্দোজা সড়কের বাসিন্দা ও কুষ্টিয়ার ওজোপাডিকোর অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ছিলেন।

ভারতের কলকাতাপারিবারিক সূত্র জানায়, অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য গত ৩ আগস্ট দেবাশীষ দত্ত ভারতের বেঙ্গালুরুর নারায়ণা হাসপাতালে গিয়েছিলেন। মহিমা দত্ত নামের আট বছর বয়সি কন্যাসন্তানকে বাবা-মায়ের কাছে রেখে স্ত্রী এবং ছেলেকে নিয়ে দেবাশীষ কলকাতায় যান। গতকাল সকালে কলকাতা থেকে তাঁর কুষ্টিয়া ফেরার কথা ছিল।

দেবাশীষের পিতা দিলীপ কুমার দত্ত জানান, আগের দিন মঙ্গলবার রাতে একাধিকবার দেবাশীষ তাঁর স্ত্রী শিম্মিন ও নাতি স্বর্ণ শিষ দত্তের সঙ্গে মোবাইল ফোনে তাদের কথা হয়েছে। এ সময় দেবাশীষ তাঁকে জানায়, বুধবার সকাল হলেই তাঁরা কলকাতার গেদে বর্ডার দিয়ে কুষ্টিয়ায় ফিরবেন। দিলীপ কুমার দত্ত ও স্বপ্না দত্তের দুই ছেলে-মেয়ের মধ্যে দেবাশীষ বড়। মেয়ে তিথি বিবাহিত এবং স্বামীর সঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জে বসবাস করেন।

পারিবারিক সূত্র জানায়, স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য মেডিকেল ভিসা নিয়ে গত ৩ আগস্ট কুষ্টিয়া থেকে কলকাতায় যান দেবাশীষ। ওই দিন কলকাতা থেকে বিমানযোগে বেঙ্গালুরু যান। স্ত্রী এবং ছেলেকে ডাক্তার দেখিয়ে সোমবার রাত ১১টার দিকে আবারও বিমানযোগে বেঙ্গালুরু থেকে কলকাতায় ফিরে ওই হোটেলে ওঠেন। প্রয়োজনীয় ওষুধপত্রসহ মেয়ে এবং পরিবারের জন্য কেনাকাটা করতে পরের দিন দেশে না ফিরে কলকাতায় থেকে যান। গতকাল সকালে সবাইকে নিয়ে দেশে ফেরার কথা ছিল। কলকাতায় অবস্থানকালে দেবাশীষ সমাজমাধ্যমে তাদের ভ্রমণ ও চিকিৎসা সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য ও ছবি প্রকাশ করেন। একটি পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, ‘টানা ১৩ দিন পর বেঙ্গালুরু বাই বাই…’।

দেবাশীষের মৃত্যুতে কুষ্টিয়ার গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পরিবার এবং স্বজনদের মধ্যেও চলছে শোকের মাতম।

এদিকে দেবাশীষসহ চারজনের লাশ গ্রহণের জন্য দেবাশীষের একমাত্র বোন তিথির ভাসুর মালদা নিবাসী কৃষ্ণ নন্দী বর্তমানে কলকাতায় অবস্থান করছেন। নিজের পায়ের চিকিৎসার জন্য মঙ্গলবার মালদা থেকে রাত ১১টায় ছেলেকে নিয়ে কলকাতার উদ্দেশে রওনা দেন। সকাল ৮টায় তিনি কলকাতায় পৌঁছান। মৃত্যুর সংবাদ জানতে পেরে তিনি বিকাল ৪টার দিকে হাসপাতালে ছুটে যান। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ময়নাতদন্তের জন্য নিহত ৯ জনের লাশ কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তিনি বর্তমানে সেখানে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারাও সেখানে আছেন। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পর বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা নাগাদ বাংলাদেশ দূতাবাসে আনুষঙ্গিক কাজ সম্পন্ন করার পর বলা যাবে লাশ কখন দেশে আনা যাবে। তিনি দেবাশীষসহ চারজনের লাশ কলকাতার গেদে বর্ডার দিয়ে কুষ্টিয়া নিয়ে আসা হবে বলে জানিয়েছেন। কুষ্টিয়া প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি আল-মামুন সাগর জানান, একজন নির্মোহ, অত্যন্ত পরিশ্রমী এবং মেধাবী সংবাদকর্মী ছিলেন দেবাশীষ। লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে উঠে সার্বক্ষণিক সাংবাদিক ছিলেন তিনি। তাঁর মৃত্যুতে কুষ্টিয়া জেলা মেধাবী এবং একজন পরিচ্ছন্ন গণমাধ্যমকর্মীকে হারাল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights