শীতেও উষ্ণতা ছড়ায় ঐতিহ্যের মাটির ঘর
নজরুল মৃধা, রংপুর:
প্রকৃতিতে এখন শীতের আমেজ। ঘন কুয়াশা, হিমেল হাওয়ায় সর্বনিম্ন তাপ মাত্রা ৯ থেকে ১২ ডিগ্রী সেলসিয়াসে উঠানামা করছে। প্রকৃতির এমন আচরণে শীতে জবুথুবু সবাই। এই অবস্থায় উষ্ণতার পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে রংপুর অঞ্চলের ঐতিহ্যের মাটির ঘর।
এই ঘরের বৈশিষ্ট হচ্ছেশীতকালে উষ্ণতা এবং গরমকালে শীতল পরশ। আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যের মাটির ঘর এখন বিলুপ্তির পথে। তবে কেউ কেউ এখনো ধরে রেখেছেন বাপ-দাদার ঐতিহ্য গ্রাম বাংলার চিরন্তন মাটির ঘর। আগে রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের প্রতিটি গ্রামে এই ঘর দেখা গেলেও এখন আর আগের মত নেই। হাতে গোনা দু’চারজন বাপ দাদার এই ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছেন। ঝড়-বৃষ্টির পাশাপাশি প্রচন্ড গরমের সময় ঠান্ডা আর শীতকালে গরম অনুভূত এই মাটির ঘর বলা চলে হারিয়ে যেতে বসেছে।
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের শাল্টি এলাকার মাটির ঘরে বসবাসকারি সামসুজ্জামান, আনারুল ইসলাম, লাল মিয়াসহ অনেকেই মাটির ঘর প্রসঙ্গে জানালেন, বাপদাদারা মাটির ঘরে জীবন পার করেছেন। তাদের স্মৃতি ধরে রাখতেই তারা এখনো মাটির ঘরে বাস করেন। তারা জানান, আগে ৬ হাত প্রস্ত ৮ হাত দৈর্ঘ একটি ঘর বানাতে খরচ হত ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা। অনেক ক্ষেত্রে কোন মিস্ত্রী ছাড়াই পরিবারের সদস্যরা মিলেই এই ঘর তৈরী করতে পারতো। বর্তমানে ওই ঘর তৈরী করতে লাগে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। তাই অনেকেই এখন মাটির ঘর তৈরীতে আগ্রহ দেখায় না। তারা জানান এই ঘর তৈরী করতে এঁটেল দোআশ (লাল) মাটির প্রয়োজন। যে মাটি দিয়ে ঘর তৈরী করা হয় সেই মাটিতে কোদাল দিয়ে ভালো করে কুপিয়ে ঝুর ঝুর করে নেয়া হয়। তার সাথে পরিমাণ মতো পানি মিশিয়ে থকথকে কাদা করে নেয়া হয়। মাটি পানি দিয়ে ভিজিয়ে কাদায় পরিণত করে সেই কাদা ২০-৩০ ইঞ্চি চওড়া করে দেয়াল তৈরী করা হয়। এরপর সেই মাটি দিয়ে তৈরী করা হতো মাটির ঘর। ঘরের অন্যান্য অবকাঠামোর চেয়ে দেয়াল তৈরীতে সময় ব্যয় হয় বেশি। দেয়াল ১০ থেকে ১২ ফুট উঁচু হলে বেশ কিছুদিন ধরে রোদে শুকাতে হয়। তারপর এই দেয়ালের ওপর বাঁশের চালা তৈরি করে খড় বা টিন দিয়ে ছাউনি দেয়া হয়। সব মিলিয়ে একটি মাটির ঘর তৈরি করতে ৩ থেকে ৪ মাস পর্যন্ত সময় লাগে। কেউ কেউ আবার ঘরটি দ্বিতল করে। নিচে বসবাস দ্বিতলে ফসল ও অন্যান্য মালামাল রাখে। মাটির ঘর শীত গরম সব সময়ই আরামদায়ক। বন্যা, ভূমিকম্প বা প্রবল ঝড় না হলে এসব ঘর এক’শ বছর পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। তবে মাঝে মধ্যে সংস্কারের প্রয়োজন হয়।
বদরগঞ্জের শ্যামপুরের শিক্ষক সামসুজ্জামান, মিঠাপুকুরের হাবিবুর রহমানসহ কয়েকজন জানালেন, কখনো কখনো অতি বৃষ্টির ফলে মাটির ঘরের কিছু অংশ ধসে পড়ে। তার পরেও বাপ দাদার ঐতিহ্য ধরে রাখতে ক্ষতিগ্রস্ত ঘর পুনরায় মেরামত করে বসবাস করতে হয়।
