শেষ কার্ডটাই ব্যবহার করছে ইরান?

অনলাইন ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে গত দুই বছর ধরে ইরান চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। লেবাননে হিজবুল্লাহর শক্তি খর্ব হওয়া, সিরিয়ায় দীর্ঘদিনের মিত্র বাশার আল-আসাদের পতন এবং ইসরায়েলের সাথে সরাসরি ১২ দিনের যুদ্ধে বিপ্লবী গার্ড কোরের শীর্ষ কমান্ডারদের হারানো তেহরানকে কোণঠাসা অবস্থায় দাঁড় করিয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে নিজের অস্তিত্ব ও আঞ্চলিক প্রভাব টিকিয়ে রাখতে ইরান এখন তার শেষ শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে ইরাকি মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোকে সক্রিয় করার পরিকল্পনা করছে। সম্প্রতি ইরাকের রাজপথে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগের হিড়িক এবং প্রকাশ্য ক্ষেপণাস্ত্র মহড়া সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। তেহরান এখন তার প্রক্সি যুদ্ধের মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ইরাককে ব্যবহার করতে চাইছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গত কয়েক বছরের যুদ্ধে ইরান সচেতনভাবেই ইরাকি মিলিশিয়াদের বড় কোনো সংঘাতে জড়াতে দেয়নি। এর মূল কারণ ছিল কৌশলগত। ইরান চেয়েছিল তার সীমান্তের সবচেয়ে কাছের এবং বিশ্বস্ত এই বাহিনীকে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলা থেকে সুরক্ষিত রাখতে। যাতে চরম বিপদের সময় তাদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু বর্তমানে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা যে পর্যায়ে পৌঁছেছে তাতে বদর অর্গানাইজেশন, কাতায়েব হিজবুল্লাহ এবং হারাকাত আল-নুজাবার মতো শক্তিশালী গোষ্ঠীগুলো সরাসরি যুদ্ধের ঘোষণা দিয়ে ময়দানে নেমেছে। এমনকি ‘আউলিয়া আল-দাম’ নামক একটি গোষ্ঠী ভূগর্ভস্থ টানেলে বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের ভিডিও প্রকাশ করে নিজেদের সামরিক সক্ষমতার জানান দিয়েছে।

ইরাকি কৌশলগত বিশ্লেষক আলা আল-নাশুয়ার মতে, ইরান ইরাককে কেবল প্রতিবেশী দেশ নয় বরং তার নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখে। ইরাকের ভৌগোলিক অবস্থান এবং দেশটির শাসনব্যবস্থার ওপর তেহরানের যে রাজনৈতিক ও গোয়েন্দা প্রভাব রয়েছে, তা ব্যবহার করে ইরান পুরো অঞ্চলের সামরিক সমীকরণ বদলে দিতে চায়।

ইরানের লক্ষ্য হলো, যদি তাদের ভূখণ্ডে সরাসরি কোনো মার্কিন হামলা হয়, তবে ইরাকি মিলিশিয়াদের মাধ্যমে তারা উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি এবং ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুগুলোতে আঘাত হেনে পাল্টা চাপ তৈরি করবে। তবে এই রণকৌশল ইরাককে ভয়াবহ বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ইরাকি প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শিয়া আল-সুদানি বারবার দেশটিকে আঞ্চলিক সংঘাত থেকে দূরে রাখার ঘোষণা দিলেও, মিলিশিয়াদের এই সমান্তরাল তৎপরতা বাগদাদের সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক আমের আল-সাবায়লেহ মনে করেন, ইরানের ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ বা বিভিন্ন ফ্রন্ট থেকে ইসরায়েলকে ঘিরে ফেলার পরিকল্পনাটি ইতিমধ্যে ব্যর্থ হয়েছে। সিরিয়া ও লেবাননের ফ্রন্টগুলো এখন আর আগের মতো কার্যকর নেই, আর ইয়েমেনের হুথিরাও দূরত্বের কারণে সীমাবদ্ধ। ফলে ইরাকই এখন ইরানের হাতে থাকা একমাত্র টেকসই কার্ড। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ইরাকি ফ্রন্ট সচল করা মানেই ইরানকে রক্ষা করা নয়। বরং এর ফলে ইরাক সরাসরি মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর বর্তমান অবস্থান কেবল ইরানকে দমানোর জন্য নয়, বরং এই পুরো অঞ্চলের নতুন বিন্যাস গড়ার একটি বৃহত্তর প্রক্রিয়ার অংশ। শেষ পর্যন্ত, তেহরান তার এই শেষ তাসটি খেলে নিজেদের কতটা রক্ষা করতে পারবে, নাকি এটি পুরো ইরাক রাষ্ট্রকে একটি অন্তহীন যুদ্ধের আগুনে জ্বালিয়ে দেবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

সূত্র: আল হুররা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights