শ্রমিকের মামলা নিয়েও ভোগান্তি

আরাফাত মুন্না

পেটের দায়ে দিনরাত পরিশ্রম করা শ্রমিক যখন অন্যায়ভাবে চাকরি হারান, বেতন পান না কিংবা প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত হন; তখন শেষ আশ্রয় হয়ে ওঠে শ্রম আদালত। কিন্তু সেখানেও ভোগান্তির শেষ নেই। আইন অনুযায়ী ৬০ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। ন্যায়বিচার পেতে বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় ঘুরছেন হাজারো শ্রমিক। দেশের ১৩টি শ্রম আদালত ও একমাত্র শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালে মোট বিচারাধীন রয়েছে সাড়ে ২৭ হাজার মামলা। আর এসব আদালতে ছয় মাসের বেশি সময় বিচারাধীন মামলার সংখ্যাও প্রায় ১৪ হাজার, যা মোট বিচারাধীন মামলার অর্ধেকের বেশি। আইনজ্ঞরা বলছেন, বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতির পেছনে রয়েছে পর্যাপ্ত আদালতসংকট, অবকাঠামোগত ঘাটতি ও প্রশাসনিক জটিলতা। তাঁরা বলেন, বর্তমানে দেশে শ্রম আদালতের সংখ্যা মাত্র ১৩। এ সংখ্যা সারা দেশের শ্রমিকদের মামলা নিষ্পত্তির জন্য অপ্রতুল। আর সারা দেশের শ্রমিকদের জন্য শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনাল মাত্র একটি। আদালত কম থাকায় বিচারকদের ওপর তৈরি হয় অতিরিক্ত মামলার চাপ। ফলে সময়মতো শুনানি ও রায় দেওয়া সম্ভব হয় না। শ্রম আদালতসংশ্লিষ্টরাও বলছেন, নিষ্পত্তির তুলনায় দায়ের অনেক বেশি হয়। তাই মামলার জট বাড়ে। এদিকে আদালত সূত্র বলছেন, দীর্ঘসূত্রতার মূল কয়েকটি কারণ হচ্ছে মিস মামলা, বাদী-বিবাদীদের শুনানির দিন আদালতে না আসা, শুনানির নোটিস না পাওয়ার অজুহাত ইত্যাদি। এর বাইরেও নানান কারণ রয়েছে।

শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনাল থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশের ১৩ শ্রম আদালত ও একমাত্র শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ২৭ হাজার ৫৪৬। ১৩ শ্রম আদালতে ২৬ হাজার ৪৫৩ এবং শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ হাজার ৯৩টি মামলা বিচারাধীন। শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালে থাকা ৭০টি মামলা স্থগিত রয়েছে উচ্চ আদালতের আদেশে। এসব আদালতে ছয় মাসের (১৮০ দিন) বেশি সময় বিচারাধীন রয়েছে ১৩ হাজার ৮৩৩টি।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকার তিনটি আদালতে যথাক্রমে ৪ হাজার ৪৯৩, ৬ হাজার ৩৯৮ ও ৩ হাজার ১৬৯টি মামলা বিচারাধীন। চট্টগ্রামের দুটি শ্রম আদালতে যথাক্রমে ১ হাজার ৬৭০ এবং ৮৬৯টি মামলা রয়েছে। এ ছাড়া খুলনায় ১৬৪, রাজশাহীতে ৮৫, রংপুরে ১০২, সিলেটে ৬৪, বরিশালে ৬৮, নারায়ণগঞ্জে ২ হাজার ৮১৫, কুমিল্লায় ৩২৬ এবং গাজীপুরে ৬ হাজার ২৩০ মামলা বিচারাধীন। পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণঞ্জ ও চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি শ্রম মামলা বিচারাধীন। অন্যদিকে তিন আদালতে মামলা রয়েছে ১০০টির কম। ২০০টির কম মামলা রয়েছে দুটি শ্রম আদালতে। বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৮ ও ২০২২) অনুযায়ী, শ্রম আদালতে দায়েরকৃত মামলা ৬০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে। যদি এ সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি সম্ভব না হয়, তবে উপযুক্ত কারণ লিখে আদালত সময় আরও ৯০ দিন বাড়াতে পারে। সব মিলিয়ে আইনে ১৫০ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির কথা বলা হয়েছে।

মামলা নিষ্পত্তির বিষয়ে জানতে চাইলে শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার মো. হেদায়েতুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমাদের কিছু সংকট রয়েছে। এর পরও মামলা নিষ্পত্তির হার আগের চেয়ে ভালো।’ তিনি বলেন, ‘মামলাজট বাড়ার মূল কারণ নিষ্পত্তির তুলনায় দায়ের বেশি হওয়া।’ মামলা দায়ের কমানো গেলে মামলাজটও কমবে বলে মনে করেন তিনি।

আইনজীবী, ভুক্তভোগী ও আদালতের অন্যান্য সূত্রের তথ্যমতে শ্রম আদালতে দেওয়ানি ও ফৌজদারি দুই ধরনের মামলাই হয়। দেওয়ানি মামলাগুলো মূলত কর্মীদের বেতন বকেয়াসংক্রান্ত। অন্যদিকে ফৌজদারি মামলাগুলো মূলত কারখানা মালিকদের আইন না মানা-সংক্রান্ত। মামলাগুলো করেছেন মূলত কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডাইফ) পরিদর্শক এবং শ্রমিক সংগঠনগুলো। এ ছাড়া রয়েছে শ্রম আদালতের আদেশ অবমাননাসংক্রান্ত মামলাও। জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘কয়েকটি শ্রম আদালতে বিচারকের সংখ্যা মামলার তুলনায় অনেক কম। অনেক সময় মামলার নথি প্রস্তুত বা সাক্ষী হাজির করার প্রক্রিয়াও দীর্ঘ হয়, যে কারণে মামলা নিষ্পত্তিতে গড়ে তিন থেকে পাঁচ বছর লেগে যাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘মামলার পরিমাণ অনুযায়ী শ্রম আদালতের কাঠামো পুনর্বিন্যাস করা প্রয়োজন। তা না হলে শ্রম আদালতের প্রতি শ্রমিক-মালিক উভয় পক্ষ আস্থা হারাবে।’ শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষায় শ্রম আইন দ্রুত যুগোপযোগী করা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।

এ বিষয়ে শ্রম অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন রাইজ ফর রাইটস ফাউন্ডেশনের (আরআরএফ) সভাপতি ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট বাহাউদ্দিন আল ইমরান বলেন, ‘শ্রম আদালতে একজন শ্রমিক মামলা করার পর রায় পর্যন্ত যেতে তাঁকে অনেক ভোগান্তির শিকার হতে হয়। দিনের পর দিন আসতে হয় আদালতে। অধিকাংশ সময়ই মালিকপক্ষের অনীহার কারণে ভোগান্তিতে পড়েন শ্রমিক।’ তিনি বলেন, ‘শ্রমিকদের ভোগান্তি কমাতে আদালতের সংখ্যা আরও বাড়ানো উচিত। একই সঙ্গে লোকবলসহ সব সংকট দূর করে শ্রমিকদের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা জরুরি।’

মহান মে দিবস আজ : আজ ১ মে, মহান মে দিবস। বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের দিন। ১৮৮৬ সালের এই দিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। ওই দিন তাদের আত্মদানের মধ্য দিয়ে শ্রমিক শ্রেণির অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য শ্রমিকদের আত্মত্যাগের এই দিনকে তখন থেকেই সারা বিশ্বে ‘মে দিবস’ হিসেবে পালন করা হচ্ছে। এবারের মে দিবসের প্রতিপাদ্য ‘সুস্থ শ্রমিক, কর্মঠ হাত, আসবে এবার নব প্রভাত’। মহান মে দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব শ্রমজীবী মানুষকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে বাণী দিয়েছেন। আজ সরকারি ছুটি। মে দিবস উপলক্ষে রাজধানীর নয়াপল্টনে আজ বেলা ২টায় শ্রমিক সমাবেশ করবে বিএনপির সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল। এতে বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বক্তব্য দেবেন। এ ছাড়া দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে শ্রমিক সমাবেশ, শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা, সেমিনার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। মহান মে দিবস উপলক্ষে জাতীয় পত্রিকাসমূহ বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে। বেতার-টেলিভিশন ও বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো দিনটি উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠান ও টকশো সম্প্রচার করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights