শ্রীলঙ্কা পারলে বাংলাদেশ পারবে না কেন

মামুন রশীদ
মাত্র তিন বছর আগে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সতর্কবার্তার নাম ছিল শ্রীলঙ্কা। বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে ২০২২ সালে দেশটি সার্বভৌম ঋণখেলাপি হয়।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কার্যত শূন্যে নেমে আসে, জ্বালানি ও ওষুধ আমদানিও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। জ্বালানি তেলের জন্য দীর্ঘ গাড়ির সারি, বিদ্যুৎবিভ্রাট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন ছিল যে অনেকেই দেশটির অর্থনীতিকে ‘হারানো কেস’ বলে মনে করেছিল।
কিন্তু মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে সেই শ্রীলঙ্কাই আবার বিশ্বব্যাংকের উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় উঠে এসেছে। ২০২৫ সালে দেশটির প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৫ শতাংশ এবং মাথাপিছু জাতীয় আয় উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছে। সংকট থেকে উত্তরণের এই গতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বিস্ময় তৈরি করেছে।

শ্রীলঙ্কার সাফল্যের রহস্য কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়। তারা নতুন কোনো অর্থনৈতিক তত্ত্ব আবিষ্কার করেনি; বরং বহু পরীক্ষিত অর্থনৈতিক নীতিগুলো কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করেছে। আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা এখানেই।

অর্থনৈতিক সংকটের পর শ্রীলঙ্কা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কর্মসূচির অধীনে রাজস্ব সংস্কার, সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি খাতে মূল্য বাস্তবায়ন, মুদ্রানীতিতে কঠোরতা এবং ঋণ পুনর্গঠনের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব সিদ্ধান্ত তারা মাঝপথে পরিবর্তন করেনি। রাজনৈতিক চাপ থাকা সত্ত্বেও ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করেছে।

বাংলাদেশেও গত কয়েক বছরে আইএমএফ-সমর্থিত বিভিন্ন সংস্কার কর্মসূচি শুরু হয়েছে। কর প্রশাসনের আধুনিকীকরণ, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, বিনিময় হার ব্যবস্থায় পরিবর্তন, ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণ—এসব পদক্ষেপের আলোচনা হয়েছে ও চলছে।

কিন্তু আলোচনার চেয়ে বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নীতি ঘোষণা করা সহজ; কঠিন হলো সেটিকে শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা।
শ্রীলঙ্কার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা। বিশ্লেষকদের মতে, দেশটির সবচেয়ে বড় শক্তি সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়, বরং তা বাস্তবায়ন করা। সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক একই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেছে এবং নিয়মিতভাবে বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করেছে। উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য এটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সমস্যার মূল অনেক সময় নীতির অভাবে নয়; বরং নীতি বাস্তবায়নের দুর্বলতা। ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ, কর আহরণের সীমাবদ্ধতা, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের অদক্ষতা কিংবা প্রকল্প বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রতা—এসব সমস্যা বহুদিন ধরেই চিহ্নিত। প্রশ্ন হলো, আমরা সমস্যাগুলোকে ধারাবাহিকভাবে সমাধানের পথে এগোতে পারছি কি না?

শ্রীলঙ্কার পুনরুদ্ধারে ঋণ পুনর্গঠনও বেশ বড় ভূমিকা রেখেছে। আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতা এবং অভ্যন্তরীণ সংস্কার একসঙ্গে এগিয়েছে। ফলে অর্থনীতি বিকশিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু বাইরের সহায়তা তখনই কার্যকর হয়, যখন দেশের নিজস্ব নীতিগত বিশ্বাসযোগ্যতা থাকে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান কিংবা উন্নয়ন সহযোগীরা কোনো দেশের হয়ে সংস্কার বাস্তবায়ন করতে পারে না, সেটি করতে হয় দেশকেই।

শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে প্রবৃদ্ধিতে রূপান্তর করেছে পর্যটন, প্রবাস আয় এবং শিল্প উৎপাদনের পুনরুদ্ধার। অর্থাৎ স্থিতিশীলতা নিজে কোনো লক্ষ্য নয়; এটি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনের ভিত্তি তৈরি করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্থিতিশীলতা এবং আর্থিক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারলে রপ্তানি, বিনিয়োগ ও বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধি আরো শক্তিশালী হতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নীতির ধারাবাহিকতা। শ্রীলঙ্কায় সরকার পরিবর্তন হলেও অর্থনৈতিক সংস্কারের মূল কাঠামো অক্ষুণ্ন রাখা হয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি একটি বড় শিক্ষা। কারণ অর্থনৈতিক সংস্কারের সুফল সাধারণত এক বা দুই বছরে আসে না, এর জন্য ধারাবাহিকতা অপরিহার্য। প্রতিটি সরকার যদি পূর্ববর্তী সরকারের প্রতিটি উদ্যোগ বাতিল করে নতুন করে শুরু করতে চায়, তাহলে কোনো সংস্কারই পরিণতি পায় না।

বাংলাদেশ আজ শ্রীলঙ্কার মতো সংকটে নেই। আমাদের অর্থনীতির ভিত্তি অনেক বিস্তৃত, রপ্তানি খাত শক্তিশালী, কৃষি উৎপাদনে সক্ষম, রেমিট্যান্সের ভিত্তিও তুলনামূলক স্থিতিশীল। অর্থাৎ আমাদের সামনে সুযোগ আরো বেশি। কিন্তু সুযোগ কখনোই সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়। সুযোগকে সাফল্যে রূপান্তর করতে হলে প্রয়োজন সঠিক নীতি, কার্যকর প্রতিষ্ঠান এবং সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ধারাবাহিক বাস্তবায়ন।

শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা আমাদের একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের কোনো শর্টকাট নেই। কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে হবে এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যেও অর্থনৈতিক সংস্কারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। যে দেশ তিন বছরের মধ্যে ঋণখেলাপির অবস্থান থেকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে ফিরতে পারে, সে দেশ আমাদের জন্য একটি উদাহরণ হতে পারে; অনুকরণ নয়, অনুপ্রেরণা।

বাংলাদেশের অর্থনীতির সম্ভাবনা শ্রীলঙ্কার চেয়ে কম নয়। আমাদের বাজার বড়, জনসংখ্যা তরুণ, শিল্পভিত্তি বিস্তৃত এবং উদ্যোক্তা শ্রেণি অনেক বেশি শক্তিশালী। তাই শ্রীলঙ্কা পারলে বাংলাদেশ পারবে না কেন? উত্তরটি আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বাস্তবায়ন এবং সুশাসনের সক্ষমতার মধ্যেই নিহিত।

লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ফিন্যানশিয়াল এক্সিলেন্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights