সংগ্রাম থেকে সাফল্য: দুই যুগে পা রাখল হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
আব্দুস সালাম, দিনাজপুর প্রতিনিধি :
উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও জনপদের ভাগ্য বদলের স্বপ্ন নিয়ে যে যাত্রার শুরু হয়েছিল, তা আজ পূর্ণ করল ২৫ বছর। ৮ এপ্রিল দুই যুগে পা রাখল হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (হাবিপ্রবি)। ১৯৭৯ সালে একটি সাধারণ কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট হিসেবে যাত্রা শুরু করে আজকের এই মহীরুহ। নানা চড়াই-উতরাই, শিক্ষার্থীদের রক্তক্ষয়ী আন্দোলন এবং সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে উত্তরবঙ্গের এই বিদ্যাপীঠ এখন বিশ্বজুড়ে মেধার স্বাক্ষর রাখছে।
বিশ্ববিদ্যালয়টির ইতিহাস যতটা গৌরবের, ততটাই সংগ্রামের। ১৯৮৮ সালে এটি কৃষি কলেজে উন্নীত হয় এবং তেভাগা আন্দোলনের কিংবদন্তি নেতা হাজী মোহাম্মদ দানেশের নামে নামকরণ করা হয়। তবে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পথচলা শুরু হয় ২০০২ সালের ৮ এপ্রিল।
প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী ফরহাদ নবীন, যিনি বর্তমানে গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, স্মৃতিচারণ করে বলেন-আমরা যখন ভর্তি হই, তখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রজ্ঞাপন হয়নি। পরীক্ষার দাবিতে রাজপথে পুলিশের পিটুনি খেয়েছি, ঢাকা ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছি। দুই বছরের সেশনজট মাথায় নিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই উচ্চতা দেখে সব কষ্ট ভুলে যাই।
হাবিপ্রবির মেধা এখন শুধু দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন বিশ্বসেরা টেক জায়ান্টগুলোতে। ১৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী রিয়াদ হোসেন বর্তমানে জাপানে লিড ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত, এর আগে কাজ করেছেন চীনের মাইক্রোসফটে। একইভাবে খাইরুল বাশার যুক্ত হয়েছেন বিখ্যাত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অ্যামাজনে।
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও অভাবনীয় সাফল্য দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি ইরাসমাস মুন্ডাস বৃত্তির আওতায় ৯ জন শিক্ষার্থী ইউরোপে গবেষণার সুযোগ পেয়েছেন। তাদেরই একজন আবুল হাসান বর্তমানে ইতালির লা-কুইলা ইউনিভার্সিটিতে গবেষণারত। তবে শিক্ষার্থীদের দাবি, আন্তর্জাতিক এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে সিলেবাসকে আরও আধুনিক ও যুগোপযোগী করা জরুরি।
কেবল তাত্ত্বিক শিক্ষা নয়, মাঠপর্যায়ের কৃষি ও সেবায় হাবিপ্রবি অনন্য। ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় যখন দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি বিপর্যস্ত, তখন হাবিপ্রবির শিক্ষার্থীরা ১০ লাখ সবজি ও ধানের চারা উৎপাদন করে বিনা মূল্যে কৃষকদের মাঝে বিতরণ করে এক অনন্য নজির স্থাপন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘কৃষক সেবাকেন্দ্র’ এবং ‘ভ্রাম্যমাণ ভেটেরিনারি ক্লিনিক’ স্থানীয় কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সেতুবন্ধন তৈরি করে দিয়েছে।
১৫০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ৯টি অনুষদের অধীনে সাড়ে ১৩ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। তবে এই বিশাল শিক্ষার্থীর তুলনায় আবাসন, পরিবহন এবং ল্যাবরেটরি সংকট এখনো প্রকট। সাংস্কৃতিক চর্চা ও খেলাধুলার সুযোগও চাহিদার তুলনায় সীমিত।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে উপাচার্য অধ্যাপক এম এনামউল্যা বলেন, আমরা সীমাবদ্ধতাগুলো চিহ্নিত করেছি। দীর্ঘদিন পর শিক্ষার্থীদের প্রাণের দাবি সমাবর্তন আয়োজন করা হয়েছে। এখন আমাদের মূল লক্ষ্য শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন এবং মাঠ গবেষণাকে আরও শক্তিশালী করা। দ্রুত সময়ের মধ্যে অবকাঠামোগত সংকট নিরসন করে বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বমানের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হবে।
২৫ বছরের এই পথচলায় হাবিপ্রবি শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং উত্তরবঙ্গের উন্নয়ন ও আধুনিক কৃষি বিপ্লবের প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।
