সত্যিই কি ইরান যুদ্ধে সৌদির নতুন দুবাই বানানো দুঃস্বপ্নে পরিণত হবে?

অনলাইন ডেস্ক
সৌদি আরবের উচ্চাভিলাষী ‘ভিশন ২০৩০’ পরিকল্পনাকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ। সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান প্রায় এক দশক আগে উদ্ভাবন, সমৃদ্ধি ও আধুনিকতার নতুন যুগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তার উচ্চাভিলাষী ‘ভিশন ২০৩০’ পরিকল্পনার মাধ্যমে তিনি আশা করেছিলেন, খুব শিগগিরই সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক ব্যবসা কেন্দ্র হিসেবে দুবাইয়ের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। এর মাধ্যমে পশ্চিমা প্রতিভা আকর্ষণ এবং সৌদির বাইরেও তার প্রভাব বিস্তার সম্ভব হবে।

তবে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা ও তেহরানের পাল্টা হামলাসহ আঞ্চলিক অস্থিরতার ফলে সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব হবে- তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট।

যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের লক্ষ্য ছিল সৌদি আরবকে আঞ্চলিক ব্যবসা কেন্দ্র হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) দুবাইয়ের সমকক্ষ করে তোলা। তবে নিজের নির্ধারিত সময়সীমা পূরণে এখন মাত্র চার বছর বাকি থাকতেই এই পরিকল্পনা হঠাৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এই সপ্তাহের শুরুতে সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কয়েকটি ইরানি ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। একই সময়ে রাস তানুরা তেল শোধনাগারে হামলায় সাময়িকভাবে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তার যে ধারণা ছিল, তা ভেঙে পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ, যেগুলোকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বিবেচনা করা হতো সেগুলোর ওপরও ইরান হামলা চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর প্রতিশোধ হিসেবে এসব হামলা চালানো হয়।

২০২৬ সালে পরপর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ দেশ হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে নাম্বিও যে তালিকায় রেখেছিল, সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সেটি এখন অনেকের কাছে অযৌক্তিক মনে হচ্ছে। গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরামের নির্বাহী পরিচালক দানিয়া থাফের দ্য ইন্ডিপেনডেন্টকে বলেন, অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের চেষ্টা করা সৌদি আরবের জন্য ‘অস্থিরতাকে স্বাভাবিক হয়ে ওঠার’ ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এটি দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।’

তার ভাষায়, ভিশন ২০৩০ ধরে নিয়েছে যে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারী, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এবং বিদেশি দক্ষ জনশক্তি সৌদি আরবকে বিনিয়োগ, উদ্ভাবন ও জীবনযাপনের জন্য একটি স্থিতিশীল পরিবেশ হিসেবে দেখবে। কিন্তু যদি উপসাগরীয় অঞ্চল আর মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে না থেকে যুদ্ধের সামনের সারির অঞ্চল হয়ে ওঠে, তাহলে সেই ধারণা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে যাবে।

যুবরাজ মোহাম্মদের পরিকল্পনার অন্যতম বড় অংশ ছিল তার মেগা প্রকল্প নিওম, যাকে মানব ইতিহাসে সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী শহর প্রকল্প হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

এই প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৩৬৩ বিলিয়ন পাউন্ড ব্যয়ে একটি পাহাড়ি স্কি রিসোর্ট, কয়েকটি উপকূলীয় রিসোর্ট এবং লোহিত সাগরের তীরজুড়ে একটি শিল্পাঞ্চল নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। পাশাপাশি ১৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘দ্য লাইন’ নামে একটি মেগাসিটি নির্মাণের পরিকল্পনাও ছিল।

কিন্তু ঘোষণার এক দশক পূর্ণ হওয়ার আগেই প্রকল্পটি নিয়ে বড় ধরনের বাধা দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন বিলম্ব এবং ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে চলতি বছরের শুরুতে জানানো হয়, প্রকল্পটির পরিসর কমানো হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ শুরু হলে পশ্চিমা দক্ষ জনশক্তি ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান আকর্ষণের ক্ষেত্রে বড় বাধা তৈরি হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধের কারণে সৌদি আরবের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে ড. কুইলিয়াম ও দানিয়া থাফের মনে করেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের তুলনায় সৌদি আরব হয়তো কম ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। দেশটির আয়তন পশ্চিম ইউরোপের সমান এবং এখন পর্যন্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতের তুলনায় কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই মাত্রার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘনত্ব এখানে দেখা যায়নি। এছাড়া সংঘাতের সময়ও অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচল চালু ছিল এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে অনেক বিদেশি নাগরিক স্থলপথে সৌদি আরবে প্রবেশ করছেন।’

তার মতে, যুদ্ধের ধাক্কা কাটিয়ে সৌদি অর্থনীতি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে, যদিও তা ধীরে ধীরে হবে। তিনি বলেন, বর্তমান সংঘাতে সৌদি আরবকে লক্ষ্যবস্তু করা স্বল্পমেয়াদে বিনিয়োগকারী ও বিদেশি কর্মীদের আস্থা কমিয়ে দেবে। তবে শেষ পর্যন্ত দেশটি ঘুরে দাঁড়াবে, সম্ভবত ধীরে, কারণ জাতীয় রূপান্তর প্রকল্পের পরিসর বিশাল এবং তেল ও গ্যাসের উচ্চমূল্য কিছু সময়ের জন্য অর্থনীতিকে সহায়তা করবে।

তবে শেষ পর্যন্ত আঞ্চলিক সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করবে যুদ্ধ কীভাবে এগোয় এবং কতদিন স্থায়ী হয় তার ওপর। তার মতে, ইরান জানে এসব হামলা ক্ষতিকর এবং তারা আশা করছে এর ফলে উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর যুদ্ধ বন্ধ করার চাপ দেবে।

তিনি বলেন, এটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল। কারণ এতে উল্টো ফলও হতে পারে, অর্থাৎ আরব উপসাগরীয় দেশগুলোকে একে অপরের আরও কাছাকাছি এনে দিতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও তাদের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights