সম্ভাবনায় বড় বাধা গ্যাসসংকট

অনলাইন ডেস্ক

দেশের শিল্পায়ন, রপ্তানি পণ্য বহুমুখীকরণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল। প্রথাগত তৈরি পোশাক বা জুতার গণ্ডি পেরিয়ে অঞ্চলটি এখন ড্রোন, ওষুধশিল্পের কাঁচামাল (এপিআই), ব্যাটারি প্লেট ও আউটডোর ইকুইপমেন্টের মতো উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর পণ্য উৎপাদনের নতুন হাবে পরিণত হচ্ছে।

এরই মধ্যে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং, শ্রীলঙ্কা ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশের বড় বড় বিনিয়োগকারীরা এখানে ভিড় জমিয়েছেন। ​তবে সম্ভাবনার এই বিশাল অর্থনৈতিক অঞ্চলে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তীব্র গ্যাসসংকট। প্রয়োজনীয় গ্যাস সংযোগ না থাকায় নতুন বিনিয়োগ যেমন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করা কারখানাগুলো তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে যেতে পারছে না। ফলে সম্ভাবনা ও সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে অর্থনৈতিক অঞ্চলটি।

​বেপজার গত ১৮ জুলাই পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, এক হাজার ৩০২ কোটি ৯১ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের এই মেগাপ্রকল্পটির কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই শেষ হয়েছে। সবচেয়ে প্রশংসনীয় বিষয় হলো, কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রেখে মূল বাজেটের তুলনায় প্রায় ১৬৩ কোটি টাকা কম ব্যয়ে প্রকল্পটির কাজ শেষ করেছে বেপজা।

​অর্থনৈতিক অঞ্চলটিতে মোট ৫৩৯টি শিল্প প্লট ও দুটি আধুনিক ছয়তলা কারখানা ভবন রয়েছে। এর মধ্যে এরই মধ্যে ৩৬০টি প্লট এবং একটি কারখানা ভবন ৫৯টি দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

সর্বশেষ গত ১৬ জুলাই চীনের বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান ‘হুয়ারুন টেক্স কোম্পানি লিমিটেড’ ৩০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে একটি টেক্সটাইল কারখানা স্থাপনে বেপজার সঙ্গে জমি ইজারা চুক্তি সম্পন্ন করেছে। এ নিয়ে অঞ্চলটিতে এ পর্যন্ত মোট ৬৩টি প্রতিষ্ঠান জমি ইজারা চুক্তি সম্পন্ন করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ১.৪৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ ছাড়া আরো ৪০টি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের জন্য বেপজার সঙ্গে চূড়ান্ত আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

​অর্থনৈতিক অঞ্চলটিতে এরই মধ্যে ১২টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুরোদমে বাণিজ্যিক উৎপাদন ও বিশ্ববাজারে রপ্তানি শুরু করেছে। এ ছাড়া আরো তিনটি প্রতিষ্ঠান বর্তমানে পরীক্ষামূলক (ট্রায়াল) উৎপাদনে রয়েছে। বর্তমানে এই জোনে রপ্তানি ও কর্মসংস্থান উভয় ক্ষেত্রেই শীর্ষে রয়েছে ‘কাইজি লঞ্জারি বাংলাদেশ’। চীনা মালিকানাধীন এই প্রতিষ্ঠানটি ১৮.৯১ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে এরই মধ্যে ৩৪.৫৬ মিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক বিশ্ববাজারে রপ্তানি করেছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি তিন হাজার ৬৫১ জন বাংলাদেশি নাগরিকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে।

অন্যদিকে প্রথম রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইতিহাস গড়া ‘কেপিএসটি শুজ (বিডি)’ ৯.১ মিলিয়ন ডলারের ফুটওয়্যার অ্যাকসেসরিজ রপ্তানি করেছে। এ ছাড়া মিংদা (বাংলাদেশ) নিউ ম্যাটেরিয়াল, ফেংকুন কম্পোজিট ম্যাটেরিয়াল, জিবিন টেকনোলজি, তাইশেং (বাংলাদেশ) ওয়েবিং এবং ভারনন অ্যান্ড অলিভার ফার্নিচারসহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠান নিয়মিত উৎপাদন ও রপ্তানি চালিয়ে যাচ্ছে।

​বিনিয়োগের এমন জোয়ারের মধ্যেই বড় বাধা জ্বালানিসংকট। উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, কারখানা প্রস্তুত এবং বায়ারদের (ক্রেতা) অর্ডার হাতে থাকলেও প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ না থাকায় তাঁরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ছেন। বর্তমানে ১৫টি প্রতিষ্ঠান কোনোমতে বিকল্প উপায়ে উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম সচল রাখলেও গ্যাসের অভাবে মূল সক্ষমতার অর্ধেকও ব্যবহার করতে পারছে না।

​বেপজার নির্বাহী পরিচালক (বিনিয়োগ উন্নয়ন) মো. তানভীর হোসেন বলেন, ‘বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের যে বিপুল আগ্রহ, তাতে গ্যাস সংযোগ শতভাগ নিশ্চিত করা গেলে বর্তমানের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বিনিয়োগ তাৎক্ষণিকভাবে আনা সম্ভব হতো। আমরা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি।’

​গ্যাসসংকটের পাশাপাশি কাস্টমস সেবার জটিলতাকেও আরেকটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। জোনের ভেতরে কাস্টমসের সব ধরনের ওয়ান-স্টপ ডিজিটাল সেবা না থাকায় আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত ছোটোখাটো দাপ্তরিক কাজেও উদ্যোক্তাদের জোনের বাইরে কাস্টমস হাউসে ছুটতে হচ্ছে। এতে ব্যবসায়ীদের সময় অপচয় হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে লিড-টাইম (পণ্য পৌঁছানোর সময়) বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

বেপজার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে, বিদ্যমান গ্যাস ও কাস্টমস সংকট দ্রুত সমাধান করা জরুরি। কারণ এই অঞ্চলটি পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হলে এখানে প্রায় ২.৯ বিলিয়ন (২৯০ কোটি) ডলারের বিশাল বিদেশি বিনিয়োগ নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে এখান থেকে প্রতিবছর চার থেকে পাঁচ বিলিয়ন (৪০০ থেকে ৫০০ কোটি) ডলারের বৈচিত্র্যময় পণ্য বিশ্ববাজারে রপ্তানি করা সম্ভব হবে, যা দেশের চলমান ডলার সংকট ও রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে ঢাল হিসেবে কাজ করবে। এই একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলই দেশের প্রায় পাঁচ লাখ বেকার মানুষের বিশাল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে এক নতুন বিপ্লবের সূচনা করবে।

সূত্র : কালের কণ্ঠ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights