সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে পাহাড়ি নারীদের পিনন হাদি

ফাতেমা জান্নাত মুমু, রাঙামাটি
সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে পাহাড়ি নারীদের পিনন হাদি। নাম যেমন সুন্দর, কাপড়েও রয়েছে বিশেষ আকর্ষণ। পিনন ও হাদি। অর্থাৎ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মধ্যে চাকমা নারীদের পরিদানের বিশেষ বস্ত্রের নাম। ওড়নার মত গায়ে জড়ানো অংশকে বলা হয় ‘হাদি’ আর কোমরে পেছানোটাকে বলা হয় ‘পিনন’। চাকমা ভাষায় এ বস্ত্রের এক সাথে নাম রাখা হয় পিনন হাদি।

পার্বত্যাঞ্চলে চাকমা নারীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পিনন-হাদি এখন পাহাড়ের গন্ডি পেরিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এ পোশাক বিক্রির মাধ্যমে শত শত পাহাড়ি নারী স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি এই সম্ভাবনাময় কুটির শিল্পটির প্রসার ঘটছে তিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, রাঙামাটির পাহাড়ি পল্লীগুলোতে এখন প্রতিটি ঘরে ঘরে তৈরি হচ্ছে পিনন হাদি। বিশেষ করে রাঙামাটির রাঙাপানী ও রাজবাড়ি এলাকায় নারীরা নিজ উদ্যোগে গড়ে তুলেছে ক্ষুদ্র কুটির শিল্প। কোনো মেশিন লাগে না। শুধুমাত্র জঙ্গলের কাঠ আর বাঁশ দিয়ে তৈরি করা যায় পিনন হাদি তৈরি বিশেষ যন্ত্র। অর্থাৎ কোমর তাঁত। এ তাঁতে লাগে না কোনো বিদ্যুৎ, কোনো রকম তৈল। শুধু লাগে পরিশ্রম আর রঙের সুতা। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী নারীদের জন্য এ পদ্ধতি সহজ হওয়ায় ঘরে বসে গড়ে তুলেছে নিজেদের কর্মসংস্থান। কোমর তাঁতে বুনন করা পিনন হাদি বেশ আকর্ষণীয়। তাই চাহিদাও বেশি। আবার দামও বেশি। রাঙামাটিতে সাপ্তাহে দু’দিন মাত্র বসে এ পিনন হাদির হাট। প্রতি শনিবার ও বুধবার। এক হাটে পিনন ও হাদি বেচা বিক্রি হয় প্রায় লাখ টাকা।

স্থানীয় কল্পনা চাকমা বলেন, পিনন হাদি আগে আমরা নিজেরা পরিদানের জন্য তৈরি করতাম। কিন্তু এখন ব্যবসার জন্য করি। এক জোড়া রেশমি সুতার পিনন হাদি তৈরি করতে প্রায় অর্ধমাস সময় লাগে। দক্ষ হাত হলে ১০ দিনের মধ্যে শেষ করা যায়। প্রথম প্রথম কঠিন মনে হতো। এখন কাপড় বুননে একটা নেশা হয়ে গেছে। যখন এ কাপড় বাজারে চড়া দামে বিক্রি করতে পারি তখন আরও বেশি আগ্রহ বেড়ে যায়।

অন্যদিকে বুধবার ছিল রাঙামাটি বনরূপা বাজারে পিনন হাদির হাটের দিন। ভোর থেকে শহরের বনরূপা, রাজবাড়ি ও সমতাঘাটে পিনন হাদির প্রসরা সাজিয়ে বসেছে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারীরা। নানা রঙে রেশমি সুঁতায় তৈরি পিনন হাদি নিয়ে এসেছে নারী ব্যবসায়ীরা। ভিড় দেখা যায় পাইকারি ও খুচরা ক্রেতাদের। কাপড়ের মান আর নকশার ডিজাইনের কারণে ভিন্নতা রয়েছে দামেও। প্রতি জোড়া পিনন হাদির দাম নিধারণ করা হয় ডিজাইন ভেদে এক জোড়া সাধারণ পিনন হাদির সর্বনিম্ন দাম ৮ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা। একটু আকর্ষণীয় ডিজাইনের পিনন হাদির দাম ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা। আর বিয়ে কিংবা পার্টির জন্য তৈরি পিনন হাদি বিক্রি হয় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত। তবে সুতার তৈরি পিনন হাদির কাম কিছুটা কম রয়েছে।

রাঙামাটির রাঙাপানি এলাকার পিনন হাদি তৈরি কারিগর মহিনি চাকমা বলেন, পাইকারি ব্যবসায়ীরা আমাদের সুতার জোগান দেন। আমরা শুধুমাত্র মজুরি নেই। আর সুতা না দিলে রঙ-বেরঙের আর ডিজাইনে উপর কাপড়ের সুঁতার দাম একটু বেশি। তাই মজুরি আর সুঁতার টাকার হিসেব করে দাম নিধারণ করা হয়।

পিনন হাদি বিক্রেতা জতিকা চাকমা বলেন, একটা সময় আমি নিজেও এ পিনন হাদি তৈরি করতাম। কিন্তু এখন সময় পাই না। তবে যারা বুনন করে তাদের কাছ থেকে পাইকারি ক্রয় করে আবার হাটে তুলি। এতে লাভ বেশি হয়। সবচেয়ে ভালো দাম মিলে পর্যটন মৌসুমে। দূর দুরান্তের পর্যটকরা বেশি পছন্দ করে এ পিনন হাদি। তখন বেশি বেচাবিক্রি থাকে। তবে পাহাড়ের কোমর তাঁতে তৈরি কাপড় এখন কক্সবাজার, ঢাকা ও চট্টগ্রামে বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত হচ্ছে।

সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে পাহাড়ের এসব নারী উদ্যোক্তারা কর্মসংস্থানের পরিধি আরও বিস্তৃত করতে পারবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights