সর্বদা পরকালের জন্য প্রস্তুত থাকার গুরুত্ব

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা
বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যা কিছু আছে, সব কিছুর নিয়ন্ত্রণ একমাত্র আল্লাহর হাতে। তিনিই সর্বশক্তিমান। সব কিছুর কর্মবিধায়ক একমাত্র তিনিই। তাঁর রাজত্বের সীমানা অতিক্রম করার সাধ্য কারো নেই।

তিনি ছাড়া আর কোনো আশ্রয়দাতা নেই। তিনি যা চান, তাই হয়। এমনকি তিনি যদি এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে ধ্বংস করতে চান, তা মুহূর্তেই বাস্তবায়ন হয়ে যাবে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আর আমার আদেশ তো কেবল একটি কথা, চোখের পলকের মতো।’ (সুরা : আল ক্বামার, আয়াত : ৫০)

অর্থাৎ কিয়ামত সংঘটনের জন্য আমাকে কোনো বড় প্রস্তুতি নিতে হবে না কিংবা তা সংঘটিত করতে কোনো দীর্ঘ সময়ও ব্যয়িত হবে না। আমার পক্ষ থেকে একটি নির্দেশ জারি হওয়ার সময়টুকু মাত্র লাগবে। নির্দেশ জারি হওয়া মাত্রই চোখের পলকে তা সংঘটিত হয়ে যাবে।

যার একটি ঝলক শুক্রবার ঢাকাবাসী অনুভব করেছে।

হঠাৎ কেঁপে ওঠা ঢাকা শহরের এক মুহূর্তের জন্য সবাই মৃত্যুকে স্মরণ করেছে। মহান আল্লাহর দয়া না থাকলে হয়তো পরশু দিনই শহরের বহু মানুষ প্রাণ হারাত। সাজানো-গোছানো এই শহর রূপান্তরিত হতো এক মৃত্যুপুরীতে। দুনিয়াকে ঘিরে করা মানুষের সব আয়োজন এক নিমেষে মাটিতে মিশে যেত। মহান আল্লাহ চাইলে এভাবেই এক মুহূর্তে সব কিছু নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারেন।

তাঁর প্রবল ক্ষমতার জানান দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘তাঁর ব্যাপার শুধু এই যে কোনো কিছুকে তিনি যদি ‘হও’ বলতে চান, তখনই তা হয়ে যায়।’ (সুরা : ইয়াসিন, আয়াত : ৮২)

তিনি যদি কাউকে মৃত্যু অথবা কোনো বিপদ দিতে চান, তা থেকে নিস্তার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। মৃত্যু অনিবার্য সত্য। মৃত্যুর স্বাদ সবাইকে আস্বাদন করতে হবে। এই জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব সবাইকে দিতে হবে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘বলো যে মৃত্যু হতে তোমরা পলায়ন করছ, তা অবশ্যই তোমাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে। তারপর তোমাদেরকে অদৃশ্য ও দৃশ্য সম্পর্কে পরিজ্ঞাত আল্লাহর কাছে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। তারপর তিনি তোমাদের জানিয়ে দেবেন, যা তোমরা করতে।’ (সুরা : জুমা, আয়াত : ৮)

তবে এই আয়াতে এই কথা উদ্দেশ্য নয় যে কোনো বিপজ্জনক পরিস্থিতি দেখা দিলে মানুষ তার নিরাপত্তার জন্য সেখান থেকে প্রস্থানের চেষ্টা করবে না। বরং এ রকম পরিস্থিতি দেখা দিলে অবশ্যই তা থেকে নিরাপদে থাকার চেষ্টা করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ কোথাও অগ্নি দুর্ঘটনা দেখা দিলে সেখান থেকে অবশ্যই নিরাপদে সরে যেতে হবে। আমাদের প্রিয় নবী (সা.) একবার একটি কাত হয়ে পড়া প্রাচীরের নিচ দিয়ে যাওয়ার সময় দ্রুত চলে গিয়েছিলেন। (মুসনাদে আহমদ)

মূল বিষয় হলো, মৃত্যু যেহেতু আমাদের জন্য অনিবার্য, আমাদের সবাইকেই ডাক পড়া মাত্র আল্লাহর কাছে ফেরত যেতে হবে এবং কৃতকর্মের হিসাব দিতে হবে, তাই আমাদের উচিত হচ্ছে, সর্বদা কৃত গুনাহের জন্য মহান আল্লাহর কাছে অনুতপ্ত হয়ে তওবা করা। সামনের দিনগুলোতে পাপ না করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করা।

মহান আল্লাহ যাতে ঈমান অবস্থায় তাঁর কাছে ফিরে যাওয়ার তাওফিক দান করেন, সে জন্য মহান আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া। হাদিস শরিফে এসেছে, মহানবী (সা.) সাহাবায়ে কেরামকে প্রতিদিন শোয়ার সময় এসব বিষয়ে আল্লাহর সাহায্য চাওয়ার প্রতি গুরুত্বারোপ করতেন।

আল-বারাআ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যখন তুমি শোয়ার জন্য বিছানায় যেতে চাও সে সময় নামাজের অজুর মতো অজু করো, অতঃপর তোমার ডান কাতে শয়ন করো, অতঃপর বলো, ‘হে আল্লাহ! আমার চেহারা আমি তোমার দিকে সোপর্দ করলাম, আমার সমস্ত বিষয় তোমার কাছে সমর্পণ করলাম, আশা ও ভয় নিয়ে তোমার দিকে আমার পিঠ সঁপে দিলাম, তোমার হতে (পালিয়ে) আশ্রয় নেওয়ার এবং রক্ষা পাওয়ার তুমি ব্যতীত আর কোনো জায়গা নেই। আমি ঈমান আনলাম তোমার অবতীর্ণ কিতাবের ওপর এবং তোমার পাঠানো নবীর ওপর।’ তারপর যদি ওই রাতে তুমি মারা যাও, তাহলে দ্বিনের (ইসলামের) ওপরই মৃত্যুবরণ করবে। (তিরমিজি, হাদিস : ৩৫৭৪)

মৃত্যু সম্পর্কে আবু বকর (রা.)-এর সুন্দর একটি উক্তি আছে। আয়েশা‌ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) মদিনায় শুভাগমন করলে আবু বকর (রা.) ও বিলাল (রা.) জ্বরাক্রান্ত হয়ে পড়লেন। আবু বকর (রা.) জ্বরাক্রান্ত হয়ে পড়লে তিনি এ কবিতাংশটি আবৃত্তি করতেন—

‘প্রত্যেকেই স্বীয় পরিবারের মাঝে দিনাতিপাত করছে, অথচ মৃত্যু তার জুতার ফিতা অপেক্ষা সন্নিকটবর্তী।’ (বুখারি, হাদিস : ১৮৮৯)

তাই বুদ্ধিমানের কাজ হলো, সর্বদা মৃত্যুকে স্মরণ করা। পরকালের প্রস্তুতি নেওয়া। গুনাহ ছেড়ে দেওয়া এবং যতটা সম্ভব নেক আমল করার চেষ্টা করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি যে নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের জন্য কাজ করে। আর নির্বোধ ও অকর্মণ্য সেই ব্যক্তি যে তার নফসের দাবির অনুসরণ করে এবং আল্লাহর কাছে বৃথা আশা করে। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪২৬০)

কারণ আমরা কেউ জানি না, আগামীকাল আমাদের সঙ্গে কী ঘটবে। আমরা কেউই জানি না যে কখন আমাদের মৃত্যু চলে আসবে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর কেউ জানে না আগামীকাল সে কী অর্জন করবে এবং কেউ জানে না কোন স্থানে সে মারা যাবে। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত।’

(সুরা লোকমান, আয়াত : ৩৪)

মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে ঈমানদার অবস্থায় থাকার তাওফিক দান করুন এবং মৃত্যুর সময়ও ঈমান অবস্থায় মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দেওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights