সর্বশেষ শিকার ক্রিকেটার নাঈম

মুহাম্মদ সেলিম ও আজহার মাহমুদ, চট্টগ্রাম

যানজটহীন প্রশান্তির যাত্রা হওয়ার কথা ছিল স্বপ্নের এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের। রাতের আঁধারে সেই এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে উঠেছে সাধারণ যাত্রীদের জন্য মূর্তিমান আতঙ্ক। অভিযোগ উঠেছে, নগরীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এক্সপ্রেসওয়েতে পুলিশের বসানো অস্থায়ী দুটি তল্লাশি চৌকি এখন কার্যত ‘চাঁদাবাজির অভয়াশ্রম’।

জানা যায়, ছিনতাইকারী বা অপরাধীদের ধরার বদলে এই চেকপোস্টগুলোতে সন্ধ্যা নামলেই পাতা হয় সাধারণ মানুষের পকেট শিকারের ফাঁদ। এই ফাঁদের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতগামী পর্যটক ও বিদেশফেরত রেমিট্যান্স যোদ্ধারা। রক্ষকের পোশাকে থাকা কিছু অসাধু সদস্যের হাতে প্রতিনিয়ত হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল ও সর্বস্বান্ত হচ্ছেন তারা। যার সর্বশেষ শিকার হয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের তারকা স্পিনার নাঈম হাসান। এই চাঁদাবাজির নেপথ্যে কাজ করছে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট। যেখানে যুক্ত আছে পুলিশের কিছু অসাধু সদস্য এবং তাদের পালিত কথিত ‘সোর্স’। সিএমপির মুখপাত্র ও অতিরিক্ত উপকমিশনার আমিনুর রশিদ বলেন, ‘তল্লাশির নামে জনসাধারণকে হয়রানির কোনো সুযোগ নেই। যদি কোনো সদস্য এ ধরনের কাজ করে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জাতীয় দলের ক্রিকেটারকে হয়রানি করায় কয়েকজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।’ বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের তারকা স্পিনার নাঈম হাসান বলেন, গাড়িতে সোনা চোরাচালান রয়েছে এমন অজুহাতে লালখান বাজার এলাকায় তল্লাশি করে পুলিশ ও কথিত সোর্স। আমাকে গাড়ি থেকে টেনে নামিয়ে লাঠি ও পাইপ দিয়ে মারধর করে পুলিশ। পরে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে গাড়িতে তুলে থানায় নিয়ে যায়। আমার সঙ্গে যদি এমন আচরণ করা হয়, সাধারণ মানুষের সঙ্গে তারা কেমন আচরণ করে তা বোঝাই যায়।

জানা যায়, সন্ধ্যা নামলেই রীতিমতো ভয়ংকর রূপ নেয় চট্টগ্রামের এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। পুলিশ নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে ব্যক্তিগত গাড়ি, সিএনজি ট্যাক্সি ও মোটরসাইকেল থামানো হলেও, তল্লাশিকারীদের মূল রাডার থাকে দম্পতি বা প্রেমিক যুগলদের দিকে। পর্যটকদের হয়রানি করে যা আদায় হয়, তার চেয়েও বড় ‘শিকার’ মেলে বিমানবন্দর থেকে আসা প্রবাসীদের গাড়িতে। এই চাঁদাবাজির নেপথ্যে কাজ করছে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট। যেখানে যুক্ত আছে পুলিশের কিছু অসাধু সদস্য এবং তাদের পালিত কথিত ‘সোর্স’। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, বিমানবন্দর এলাকায় আগে থেকেই ওত পেতে থাকে পুলিশের সোর্সরা। কোনো প্রবাসী লাগেজ নিয়ে গাড়িতে উঠলেই তার তথ্য চলে যায় চেকপোস্টে থাকা অসাধু সদস্যদের কাছে। এক্সপ্রেসওয়েতে গাড়ি থামিয়ে প্রবাসীদের সোজা ‘চোরাকারবারি’ আখ্যা দেওয়া হয়। তল্লাশির নামে প্রবাসীর সঙ্গে থাকা মূল্যবান জিনিসপত্র এবং পরিবারের জন্য আনা সামান্য স্বর্ণালংকারও কেড়ে নেওয়া হয়। বছরের পর বছর হাড়ভাঙা খাটুনির টাকায় কেনা স্বর্ণ কেড়ে নেওয়ার প্রতিবাদ করলেই নেমে আসে নানান খড়গ। হুমকি দেওয়া হয় সাজানো চোরাচালান বা মাদক মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার।

গত শুক্রবার রাতে অভিন্ন কায়দায় জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানের ট্যাক্সিতে ‘সোনা চোরাচালানের’ অজুহাতে তল্লাশি চালানো হয়। এ সময় দুই দফায় নাঈমকে মারধর ও হেনস্তা করা হয়। এ ঘটনার পর নড়েচড়ে বসে চট্টগ্রামের প্রশাসন। কয়েক সপ্তাহ আগে এমন অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে সৈকতে বেড়াতে যাওয়া এক পর্যটক বলেন, সন্ধ্যার পর তিনি তার মেয়ে বন্ধুকে নিয়ে পতেঙ্গা সৈকতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। রাতে সৈকত থেকে ফেরার সময় পুলিশ তাদের গাড়ি থামিয়ে পরিচয় জানতে চায়। এ সময় তারা বিভিন্ন অসংলগ্ন ও অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করতে থাকে। রাতের বেলা সৈকতে যাওয়ার কারণ জানতে চায় পুলিশ। একপর্যায়ে তল্লাশিকারীদের একজন পুলিশকে খুশি করার কথা বলেন। পরে তারা পুলিশকে অর্থ দিয়ে সেখান থেকে ছাড়া পান।

খুলশী থানার ওসি প্রত্যাহার : ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে মারধর ও হেনস্তার অভিযোগ ওঠার পর সিএমপি খুলশী থানার ওসি মো. আরিফুর রহমানকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। শনিবার রাতে কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী এ আদেশ দেন। সিএমপির মুখপাত্র ও অতিরিক্ত উপকমিশনার আমিনুর রশিদ বলেন, খুলশী থানার ওসি আরিফুর রহমানকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে যুক্ত করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights