সাংস্কৃতিক পরিসরে কী হচ্ছে?

বাংলাদেশের জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কেন্দ্রে একটি বড় ধরনের বৈপরীত্য রয়েছে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল স্বাধীনতা, মর্যাদা ও কর্তৃত্ববাদ থেকে মুক্তি।

অথচ প্রায় দুই বছর পর জনপরিসরে আরেক ধরনের নিয়ন্ত্রণ ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে—মব বা সংঘবদ্ধ জনতার চাপ ও ভয় দেখানোর ক্ষমতা।

এটি শুধু আইন-শৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়; এটি সংস্কৃতিরও প্রশ্ন। কোনো গান কাউকে বা কোনো গোষ্ঠীকে ক্ষুব্ধ করতে পারে কি না, সেই হিসাব করে শিল্পীকে গান গাইতে হলে; নাট্য আয়োজকদের অনুষ্ঠান বাতিলের আশঙ্কায় থাকতে হলে; সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের চাপে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী বন্ধ হয়ে গেলে; লোকশিল্পী হুমকির মুখে পড়লে; কিংবা সংবাদপত্র ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ক্ষুব্ধ জনতার লক্ষ্যবস্তু হলে—তখন একটি সমাজ তার সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা হারাতে শুরু করে।

এই কারণেই ১১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের জাতীয় সম্মেলনের আলোচনা আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

দেশের বিভিন্ন প্রান্তের প্রতিনিধিরা সেখানে এমন এক সাংস্কৃতিক পরিবেশের কথা বলেছেন, যেখানে হুমকির কারণে অনুষ্ঠান বাতিল হচ্ছে, আবার কোথাও স্থানীয় প্রশাসন অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। সম্মেলনে তৃণমূলের সাংস্কৃতিক কর্মীদের বক্তব্যে সাংস্কৃতিক প্রকাশের পরিসর ক্রমে সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা উঠে এসেছে। যেমন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিরোধিতা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া হুমকির পর একটি চলচ্চিত্র প্রদর্শনী স্থগিত করা হয়।

বড় আশঙ্কার জায়গাটি হলো, বাংলাদেশ হয়তো রাজনৈতিক সেন্সরশিপের সংস্কৃতি থেকে সামাজিক ভীতি প্রদর্শনের সংস্কৃতির দিকে এগোচ্ছে।

সেখানে রাষ্ট্রকে কোনো শিল্পীর কাজ নিষিদ্ধ করতেই হবে না; জনতার হুমকিই সেই কাজটি করে দিতে পারে।

অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগে বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খুব শক্তিশালী ছিল। আগের সরকার বহু বছর ধরে বিরোধী রাজনীতি, সমালোচনামূলক গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। এখন প্রশ্ন হলো, প্রতিশ্রুত নাগরিক পরিসর কি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করার মাধ্যমে সুরক্ষিত হবে, নাকি রাষ্ট্রের দুর্বলতার সুযোগে জনতা, রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক ও ধর্মীয় চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীগুলো সেই শূন্যস্থান পূরণ করবে।

মব সংস্কৃতির উত্থান

মব সংস্কৃতির শুরু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে নয়। রাজনৈতিক সহিংসতা, সাম্প্রদায়িক হামলা ও রাজপথের জবরদস্তির দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে বাংলাদেশে। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছিল, যখন মবের রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতা সাময়িকভাবে ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়।

এর পরের ধ্বংসযজ্ঞ ছিল বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথম আলোর এক অনুসন্ধানে দেখা যায়, ৫ থেকে ১৪ আগস্টের মধ্যে ৫৯ জেলায় ১ হাজার ৪৯৪টি ভাস্কর্য, রিলিফ ভাস্কর্য, দেয়ালচিত্র ও স্মৃতিচিহ্ন ভাঙচুর, পোড়ানো বা উপড়ে ফেলা হয়। মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত স্মৃতিস্তম্ভ, জাদুঘর, স্মারক ও অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থাপনাও এর মধ্যে ছিল। এসব ঘটনার অধিকাংশই ঘটেছিল সরকার পতনের প্রথম তিন দিনে। অনেক ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা দীর্ঘ সময় পরও সংস্কার করা হয়নি।

এই সময়ের প্রতিটি ভাঙচুরকে রাজনৈতিকভাবে পরিকল্পিত বলা অতিসরলীকরণ হবে। আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতীকগুলোর বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকেই অনেক সহিংসতা ঘটেছিল। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিশোধ ও সাংস্কৃতিক ধ্বংসের সীমারেখা দ্রুত অস্পষ্ট হয়ে যায়। এক দল জনতা যখন মনে করে কোনো স্মৃতিস্তম্ভ, প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে, তখন পরবর্তী সহিংসতার পথও সহজ হয়ে যায়।

অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান মুহাম্মদ ইউনূসের প্রশাসনের সমালোচকেরা অভিযোগ করেছেন, বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক ব্যক্তি ও কর্মীরা আগের ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত বিরোধী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে মবকে উৎসাহিত করেছেন, এর সুবিধা নিয়েছেন বা তা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছেন। এসব অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে না ধরে তদন্ত করা প্রয়োজন। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মব সহিংসতা অব্যাহত ছিল—এটি নিয়ে গুরুতর বিতর্কের অবকাশ কম।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মব সহিংসতায় ১৯৭ জন নিহত হয়েছেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এ-ও বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে মব সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা অন্তত ২৯৩।

এই সংখ্যাগুলো দেখায়, আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের আস্থা যখন দুর্বল থাকে, তখন মব সহিংসতা কীভাবে বিকল্প শাস্তিব্যবস্থায় পরিণত হতে পারে। কোনো মবকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করতে রাষ্ট্রের সরাসরি নির্দেশের প্রয়োজন নেই; দায়মুক্তির একটি ধারণাই অনেক সময় যথেষ্ট।

জাতীয় প্রতীক যখন বিতর্কিত বিষয়

সাংস্কৃতিক প্রতীকের ওপর আক্রমণ এখন একটি আদর্শিক মাত্রাও পেয়েছে। জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ বাংলাদেশের সাংবিধানিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কের অংশ হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক ও আদর্শিক পরিসরের কিছু অংশ থেকে জাতীয় সংগীত পরিবর্তন এবং দেশের সাংবিধানিক কাঠামোর কিছু বিষয় পুনর্বিবেচনার দাবি উঠেছে।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আবদুল্লাহিল আমান আজমি প্রকাশ্যে জাতীয় সংগীত ও সংবিধান পরিবর্তনের কথা বলেন। পরে জামায়াতে ইসলামী জানায়, তাঁর বক্তব্য দলের আনুষ্ঠানিক অবস্থান নয়। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। আজমির বক্তব্যকে জামায়াতের জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের আনুষ্ঠানিক নীতি হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।

তবে বিতর্কটির গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। ২০২৫ সালের বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেসে দলটির সভাপতি জাতীয় সংগীত পরিবর্তন ও ১৯৭২ সালের সংবিধান বাতিলের প্রচেষ্টার সমালোচনা করেন।

জাতীয় প্রতীক নিয়ে বিতর্ক করায় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আপত্তির কিছু নেই। বিপদ তখনই, যখন সেই বিতর্কের সঙ্গে ভয় দেখানো, হুমকি কিংবা একটি সম্পূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে পর বা অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা যুক্ত হয়।

বাংলাদেশের বাঙালি সাংস্কৃতিক পরিচয় কোনো এক রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়। আওয়ামী লীগের বিরোধিতাকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, মুক্তিযুদ্ধ কিংবা দেশের ধর্মনিরপেক্ষ ও সমন্বয়বাদী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত সবকিছু ভেঙে ফেলার অজুহাত হিসেবেও ব্যবহার করা উচিত নয়।

সংবিধানে ‘আমার সোনার বাংলা’র প্রথম ১০ পঙ্‌ক্তিকে জাতীয় সংগীত হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে জাতীয় সংগীত নিয়ে তাত্ত্বিকভাবে বিতর্ক করা যাবে কি না, সেটি মূল প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক পরিবর্তনকে কি প্রজাতন্ত্রের সাংস্কৃতিক ভিত্তিকে অস্বীকার করার অজুহাতে পরিণত করা হবে?

গণতান্ত্রিক বাংলাদেশকে রাজনৈতিক দলের বিরোধিতা এবং একটি জাতির সাংস্কৃতিক স্মৃতির প্রতি বিদ্বেষের মধ্যে পার্থক্য করতে হবে।

বাউলগান থেকে সংবাদপত্রের কার্যালয়

সাংস্কৃতিক পরিসর সংকুচিত হওয়ার বিষয়টি সম্ভবত সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায় বাউল ও লোকসংস্কৃতির ক্ষেত্রে। বাউল ঐতিহ্য বাংলাদেশের সমন্বয়বাদী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম স্বতন্ত্র ধারা। কিন্তু বাউলশিল্পীরা ক্রমেই ধর্ম অবমাননা বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগের মুখে পড়ছেন।

বাউলশিল্পী আবুল সরকারের ঘটনাটি এর একটি প্রতীকী উদাহরণ। ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর লোকসংগীত পরিবেশনের সময় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিষয়টি আদালতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ২৩ নভেম্বর আবুল সরকারের মুক্তির দাবিতে মানববন্ধনের প্রস্তুতিকালে হামলায় তিনজন আহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, ‘তৌহিদী জনতা’ ব্যানারে থাকা ব্যক্তিরা এই হামলা চালান। ২০২৬ সালের এপ্রিলে হাইকোর্ট তাঁকে ছয় মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেন এবং পরে তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান।

এই ঘটনা দেখায়, কীভাবে একজন শিল্পী আইনি অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা এবং রাজপথের চাপ—এই তিনের সম্মিলিত প্রভাবে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন। কোনো শিল্পীকে চুপ করিয়ে দিতে তাঁকে অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করতেই হবে—এমন নয়। একটি ভাইরাল ভিডিও, একটি অভিযোগ এবং একটি ক্ষুব্ধ জনতাই অন্যদের গান গাওয়ার আগে দুবার ভাবার জন্য যথেষ্ট হতে পারে।

বিষয়টি অবশ্য আর শুধু ব্যক্তিশিল্পীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর মব প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে আগুন দেয়। ছায়ানটেও হামলা হয়। পরদিন সন্ধ্যায় উদীচীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আগুন দেওয়া হয়। সংবাদপত্রের কার্যালয়ে সাংবাদিকেরা আগুনের মধ্যে আটকা পড়েন এবং হামলার কারণে দুটি পত্রিকার ছাপাখানার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। রয়টার্স ঘটনাটিকে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর বড় আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছে।

এর গুরুত্ব শুধু ভবন ধ্বংসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বই ও ভবন সময়ের সঙ্গে প্রতিস্থাপন বা সংস্কার করা যায়। কিন্তু প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জমা হওয়া আর্কাইভ, বাদ্যযন্ত্র, পাণ্ডুলিপি, আলোকচিত্র ও প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি সব সময় পুনর্গঠন করা সম্ভব নয়।

দ্য ডেইলি স্টার ও ডিসমিসল্যাবের এক অনুসন্ধানে ২০২৫ সালের ১৩ থেকে ১৯ ডিসেম্বর প্রকাশিত ৩ হাজার ৬৪টি ফেসবুক পোস্ট বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, দুটি সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক প্রচারণা কয়েক দিন ধরে তৈরি হচ্ছিল এবং পরে তা নির্দিষ্ট স্থানে ভবন আক্রমণ বা পুড়িয়ে দেওয়ার সরাসরি আহ্বানে রূপ নেয়। অনুসন্ধানটি অনলাইন উসকানি ও বাস্তব সহিংসতার মধ্যে একটি স্পষ্ট যোগসূত্রের কথা তুলে ধরে।

এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়েও বড় প্রশ্ন তোলে। বাংলাদেশের বাইরে অবস্থান করা কিছু ব্যক্তিও অনলাইনে এমন বয়ান ছড়িয়ে দিতে পারেন, যা দ্রুত বাস্তব জীবনের সহিংসতায় রূপ নেয়। কোনো প্রভাবশালী অ্যাকাউন্ট থেকে প্রমাণিত মিথ্যা তথ্য বা সহিংসতার আহ্বান ছড়িয়ে পড়লে জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে, বিশেষ করে যখন অনুসারীদের বড় অংশ বাংলাদেশে থাকলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দেশের বাইরে অবস্থান করেন।

তবে এর ভিত্তিতে বাংলাদেশের প্রবাসী জনগোষ্ঠী বা বিদেশে থাকা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকর্মীদের সবাইকে অভিযুক্ত করা যাবে না। প্রশ্নটি আরও নির্দিষ্ট: কোনো প্রভাবশালী অ্যাকাউন্টের প্রচারিত হুমকি বা উসকানির পর যদি বাস্তবে সহিংসতা ঘটে, তাহলে দায় কার?

এর উত্তর মতামত নিয়ন্ত্রণ করা নয়। বরং বৈধ রাজনৈতিক বক্তব্য এবং ইচ্ছাকৃত সহিংসতায় উসকানির মধ্যে সুস্পষ্ট সীমারেখা তৈরি করা এবং তা সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা।

সংখ্যালঘুরা প্রথমেই ক্ষতিগ্রস্ত

সাংস্কৃতিক পরিসর সংকুচিত হলে সংখ্যালঘু ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীই প্রথমে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আগের সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দুদের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনায় হামলার খবর পাওয়া যায়। একেকটি ঘটনার পেছনে একেক ধরনের কারণ ছিল—রাজনৈতিক প্রতিশোধ, অপরাধ, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও স্থানীয় বিরোধ একে অপরের সঙ্গে মিশে থাকতে পারে। কিন্তু কারণ যা-ই হোক, রাজনৈতিক পরিচয় বা ধর্ম নির্বিশেষে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে সংখ্যালঘুদের ওপর ২৫৮টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৫৯টি ছিল উপাসনালয়ে হামলা এবং ২৭টি হত্যাকাণ্ড। এসব তথ্য একটি অধিকারভিত্তিক সংগঠন সংগ্রহ করেছে—তাই সেগুলোকে সেই হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত। তবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত এসব তথ্য দেয়। আরও স্পষ্ট যে উদ্বেগের জায়গাটি হলো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা—অনেক ঘটনায় দেরিতে সাড়া দেওয়া, অপর্যাপ্ত তদন্ত এবং সহিংসতার ঘটনায় মামলা ও বিচার না হওয়ার অভিযোগ।

মাজারে হামলার ক্ষেত্রেও একই ধরনের উদ্বেগ রয়েছে। ‘মাকাম: সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ’-এর ‘আটাকস অন শ্রাইনস অ্যাক্রস দ্য কান্ট্রি ইন ২০২৪–২৫’ শীর্ষক এক গবেষণায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৯৭টি মাজারে হামলার কথা বলা হয়েছে। এসব ঘটনায় তিনজন নিহত ও ৪৬৮ জন আহত হয়েছেন বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, মাত্র ১১টি ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং এর মধ্যে ১০টির তদন্তে কোনো অগ্রগতি হয়নি। গবেষণায় ৬১ শতাংশ হামলার প্রধান কারণ হিসেবে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্তত ৪৪টি হামলার শিকার মাজার পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে এবং নিয়মিত ওরস বন্ধ হয়ে গেছে বলেও এতে উল্লেখ করা হয়।

এসব তথ্যকে সরকারি পরিসংখ্যান হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। মাকামের প্রতিবেদনটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য, মাঠপর্যায়ের তথ্যসহ বিভিন্ন উৎসের ওপর নির্ভর করেছে। তবে এসব অভিযোগের তদন্ত হওয়া জরুরি, বিশেষ করে যেখানে সংঘবদ্ধ ভয় দেখানো বা ধর্মীয় স্থাপনায় হামলার অভিযোগের কোনো নিষ্পত্তি হয়নি।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব প্রতিটি ঘটনার তদন্ত করে প্রকৃত তথ্য বের করা। কোনো হামলার খবর নিয়ে বিতর্ক থাকলে সরকারকে তদন্তের ফল প্রকাশ করতে হবে। হামলা হয়ে থাকলে অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। আর অভিযোগ মিথ্যা হলে সেটিও প্রমাণের ভিত্তিতে স্পষ্ট করতে হবে। অন্যথায় তথ্যের শূন্যস্থান তৈরি হবে, যেখানে সত্যের চেয়ে রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক বয়ানই বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠবে।

শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা

শেষ পর্যন্ত বিষয়টি সংস্কৃতির চেয়েও বড়। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ এমন একটি সমাজ থাকবে কি না, যেখানে মানুষ ভয় ছাড়াই পরস্পরের সঙ্গে দ্বিমত করতে পারবে।

গণমাধ্যম ও নাগরিক স্বাধীনতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মূল্যায়নগুলোও উদ্বেগজনক। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের ২০২৬ সালের বিশ্ব সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫২তম; স্কোর ৩৩ দশমিক ০৫। ফ্রিডম হাউসের ‘ফ্রিডম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০২৬’-এ বাংলাদেশকে ১০০-এর মধ্যে ৪৪ স্কোর দিয়ে ‘আংশিক মুক্ত’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এই সূচকগুলো ভিন্ন ভিন্ন বিষয় পরিমাপ করে। আরএসএফ মূলত সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার দিকে নজর দেয়, আর ফ্রিডম হাউস রাজনৈতিক অধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতার বিস্তৃত চিত্র মূল্যায়ন করে। কোনোটিকেই বাংলাদেশের চূড়ান্ত মূল্যায়ন হিসেবে দেখা উচিত নয়। তবে দুটিই একটি বড় সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করে—মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তোলার প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা এখনো দুর্বল।

বাংলাদেশকে আরও একটি প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে—প্রতিটি সাংস্কৃতিক বিরোধকে দলীয় রাজনীতির চোখে দেখা। প্রতিটি সংবাদপত্রকে সরকারপন্থী বা সরকারবিরোধী, প্রতিটি শিল্পীকে কোনো না কোনো রাজনৈতিক শিবিরের লোক এবং প্রতিটি সংখ্যালঘু অভিযোগকে প্রতিপক্ষ দলের হাতিয়ার হিসেবে দেখলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

সংস্কৃতি রাজনীতির চেয়ে বড় হওয়ার কথা। এ কারণেই ১১ সেপ্টেম্বরের সম্মেলনটি গুরুত্বপূর্ণ। এর গুরুত্ব আয়োজক বা বক্তাদের রাজনৈতিক পরিচয়ে নয়; বরং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জীবনের তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করা মানুষদের কাছ থেকে আসা সতর্কবার্তায়। তাঁরা বলছেন, যে পরিসরে তাঁরা কাজ করেন, গান করেন, লেখেন ও সংগঠিত হন, সেটি ক্রমেই রক্ষা করা কঠিন হয়ে উঠছে। এর জবাব আরেক দফা আদর্শিক পাল্টা-মোবিলাইজেশন হওয়া উচিত নয়। প্রয়োজন প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা।

সহিংসতা ঘটে যাওয়ার পর শুধু তদন্ত নয়, তার আগেই হুমকির মুখে থাকা শিল্পী ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে নিরাপত্তা দিতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন যাতে স্বচ্ছ কারণ ছাড়া সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ বা ঠেকানোর হাতিয়ার হয়ে না ওঠে, তা নিশ্চিত করতে হবে। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া হুমকির তদন্ত করতে হবে বাস্তব হামলার আগেই। আর সহিংসতা ঘটলে দ্রুত, স্বচ্ছ এবং রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে গিয়ে তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

তথ্য নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে রাষ্ট্রকে সমস্যার মূল কারণ মোকাবিলা করতে হবে। তথ্য গোপনের কোনো পরিকল্পিত সরকারি নীতি আছে—এমন দাবি করার চেয়ে যে বিষয়টি বেশি স্পষ্ট, তা হলো দেরিতে সাড়া দেওয়া, অপর্যাপ্ত তদন্ত এবং দুর্বল জবাবদিহির একটি ধারাবাহিকতা। এসব ব্যর্থতাই যথেষ্ট গুরুতর; এগুলোকে আরও বাড়িয়ে বলার প্রয়োজন নেই।

জনপরিসর ফিরে পেতে হবে

১১ সেপ্টেম্বরের সম্মেলনের মূল বার্তাটি সহজ: রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও ডিজিটাল ভয় দেখানোর সংস্কৃতি থেকে বাংলাদেশের জনপরিসরকে ফিরিয়ে আনতে হবে। কোনো গোষ্ঠী শুধু জনতা সংগঠিত করতে পারে বলেই সংস্কৃতির ওপর ভেটো দেওয়ার অধিকার পেতে পারে না।

শিল্পী স্বাধীনভাবে গান গাইবেন, সাংবাদিক লিখবেন, চলচ্চিত্র নির্মাতা ছবি প্রদর্শন করবেন, লোকশিল্পী গান করবেন এবং সংখ্যালঘুরা ভয় ছাড়া উপাসনা করবেন—এটাই স্বাভাবিক। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অর্থ অবশ্য জবাবদিহির ঊর্ধ্বে থাকা নয়। অন্যায় বা অপরাধের অভিযোগের নিষ্পত্তি হতে হবে প্রমাণ, তদন্ত ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে; হুমকি বা সম্মিলিত শাস্তির মাধ্যমে নয়।

একটি সংস্কৃতি টিকে থাকে সবাই একমত বলে নয়, বরং মতবিরোধের সুযোগ থাকে বলেই। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকা রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরের বিপদ দেখেছে; এখন সেই পরিসরকে মবের হাতে তুলে দেওয়া উচিত নয়।

জুলাইয়ের প্রতিশ্রুতি ছিল এমন একটি সমাজ, যেখানে নাগরিকেরা ভয় কম নিয়ে কথা বলতে পারবেন। সেই প্রতিশ্রুতির প্রকৃত পরীক্ষা হবে—একজন বাউল নির্ভয়ে গান গাইতে পারেন কি না, একজন সাংবাদিক লিখতে পারেন কি না, একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা ছবি দেখাতে পারেন কি না, একজন সংখ্যালঘু নিরাপদে উপাসনা করতে পারেন কি না এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো জনতার অনুমতি না নিয়ে দেশের স্মৃতি সংরক্ষণ করতে পারে কি না।

গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য অন্তত এই সাংস্কৃতিক পরিসরটুকু নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights