সাড়ে পাঁচ শতাব্দী পেরিয়ে বাবা আদম মসজিদ, সংস্কারের দাবি

আবু সাঈদ দেওয়ান সৌরভ

সাড়ে পাঁচশ বছর ধরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে মুন্সীগঞ্জের ‘বাবা আদম শহীদ মসজিদ’। সুলতানি আমলের স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত ছয় গম্বুজের এই মসজিদে এখনও অব্যাহত রয়েছে আজানের ধ্বনি ও নামাজ আদায়। ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি প্রাচীন স্থাপত্য, ইতিহাস ও লোককথার কারণে মসজিদটি এখনো আকর্ষণ করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষকে। তবে দীর্ঘদিনের সংস্কার ও সংরক্ষণের অভাবে ঐতিহাসিক এ স্থাপনার বিভিন্ন স্থানে ফাটল ও ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন দেখা দিয়েছে।

মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার দরগাহবাড়ি এলাকায় অবস্থিত বাবা আদম শহীদ মসজিদটি নির্মিত হয় ১৪৮৩ খ্রিষ্টাব্দে, বাংলার সুলতান জালাল উদ্দিন ফতেহ শাহের শাসনামলে। ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে, তৎকালীন বিক্রমপুরের শাসক মালিক কাফুর শাহ মসজিদটি নির্মাণ করেন। কথিত আছে, প্রখ্যাত মুসলিম প্রচারক ও সাধক হযরত বাবা আদম শহীদ (রহ.)-এর মাজারের পাশে তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। এই মুসলিম সাধক ‘বাবা আদম’ নামেই বেশি পরিচিত।

বাবা আদমকে ঘিরে মুন্সীগঞ্জে রয়েছে নানা ইতিহাস ও জনশ্রুতি। ইতিহাস থেকে জানা যায়, তিনি মধ্যপ্রাচ্য থেকে ১১৭৩ সালে তৎকালীন বিক্রমপুর পরগনার রামপালে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে আসেন। তখন এ অঞ্চলে সেন রাজাদের শাসন ছিল। সেন রাজা বল্লাল সেনের সঙ্গে তার সংঘর্ষ হয়। ১১৭৮ সালে মিরকাদিম এলাকায় সংঘর্ষে বাবা আদম শহীদ হন। পরে বর্তমান দরগাহবাড়ি এলাকায় তাকে দাফন করা হয়।

বাবা আদমের জন্মস্থান ও জীবন নিয়েও বিভিন্ন মত রয়েছে। একটি বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি ১০৯৯ সালে মক্কার অদূরে তায়েফে জন্মগ্রহণ করেন। পরে আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জনের জন্য ইরাকের বাগদাদে বড় পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানির (রহ.) সান্নিধ্যে আসেন। তাসাউফের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে ভারতবর্ষে আসেন তিনি।

বাবা আদম শহীদের মৃত্যুর ৩১৯ বছর পর ১৪৮৩ সালে তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সুলতান জালাল উদ্দিন ফতেহ শাহের অনুরোধে মালিক কাফুর শাহ মসজিদটি নির্মাণ করেন বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত। মসজিদের পাশেই রয়েছে বাবা আদম শহীদ (রহ.)-এর মাজার। সেখানে প্রতি বৃহস্পতিবার এশার নামাজের পর জিকির ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিবছর বাবা আদম শহীদ (রহ.)-এর স্মরণে বার্ষিক ওয়াজ ও দোয়া মাহফিলও অনুষ্ঠিত হয়।

স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকেও মসজিদটি অনন্য। উত্তর-দক্ষিণে লম্বা মসজিদটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৩ ফুট এবং প্রস্থ ৩৬ ফুট। প্রায় চার ফুট পুরু দেয়াল লাল পোড়ামাটির ইট, সুরকি ও চুনের গাঁথুনিতে নির্মিত। সম্মুখভাগে রয়েছে তিনটি খিলানাকৃতির প্রবেশপথ। বর্তমানে মাঝের প্রবেশপথটি ব্যবহার করা হয়। প্রবেশপথের দুই পাশে রয়েছে একই আকৃতির দুটি জানালা।

মসজিদের ভেতরে রয়েছে গ্রানাইট পাথরের দুটি আকর্ষণীয় স্তম্ভ। চার কোণায় রয়েছে ত্রিভুজাকৃতির স্তম্ভ। পশ্চিম দেয়ালে রয়েছে তিনটি মেহরাব। খিলান, দরজা, স্তম্ভের পাদদেশ, মেঝে ও ছাদের কার্নিশের নিচে পাতলা ইট কেটে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মুসলিম স্থাপত্যকলার নান্দনিক নকশা। প্রধান মেহরাব ও প্রবেশপথ পোড়ামাটির লতাপাতা ও জ্যামিতিক নকশায় অলংকৃত। মসজিদের সামনের ভাগের ওপরের দিকে কালো পাথরের একটি ফলকে ফরাসি ভাষায় খোদাই করা লেখা রয়েছে। পূর্ব দেয়ালে রয়েছে আরবি লিপিতে উৎকীর্ণ শিলাফলক।

প্রায় ৫৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও এ মসজিদে নামাজের ধারা কখনো বন্ধ হয়নি বলে জানান স্থানীয়রা। বর্তমানে মসজিদের ভেতরে পাঁচ কাতারে একসঙ্গে দুই শতাধিক মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজে মসজিদের ভেতর ও বাইরে মিলিয়ে প্রায় ৫০০ থেকে ৭০০ মুসল্লির সমাগম হয়। জায়গা সংকুলান না হওয়ায় অনেক মুসল্লিকে মসজিদের বাইরেও নামাজ আদায় করতে হয়।

অন্য এলাকা থেকে আসা এক মুসল্লি বলেন, ‘এখানে আসলে আত্মতৃপ্তি পাই। এই মসজিদে নামাজ পড়লে শান্তি লাগে। তাই এখানে মাঝে মধ্যে নামাজ পড়তে আসি।’ এক দর্শনার্থী বলেন, ‘কয়েকশ বছরের পুরোনো মসজিদ দেখার অনেক ইচ্ছে ছিল। এসে দেখলাম আসলেই অনেক সুন্দর। মসজিদের ভেতরে ঢুকলে অন্যরকম প্রশান্তি লাগে।’

মসজিদের সানী ইমাম মাওলানা সানাওল্লাহ বলেন, ‘মসজিদটি প্রায় সাড়ে পাঁচশ বছরের পুরোনো। মসজিদের ভেতরে গরমের সময় ঠান্ডা অনুভূত হয়, আর শীতে গরম। দেশের নানা প্রান্তের মানুষ এখানে নামাজ আদায় করতে আসেন। মসজিদটি প্রত্নসম্পদ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ইসলামি সংস্কৃতির এই মসজিদটি রক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।’

১৯৪৮ সাল থেকে ঐতিহাসিক এ স্থাপনাটি বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ বাবা আদম মসজিদের ছবি সংবলিত একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করে।

তবে দীর্ঘদিন ধরে যথাযথ সংস্কার ও সংরক্ষণের অভাবে মসজিদটির বিভিন্ন স্থানে ক্ষয়ক্ষতি দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। দেয়ালের কোথাও কোথাও শ্যাওলা জমেছে, কয়েকটি স্থানে দেখা দিয়েছে ফাটল। বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি মসজিদের ভেতরে গড়িয়ে পড়ে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

মসজিদ কমিটি সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১৪ থেকে ১৫ বছর আগে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে মসজিদটি সংস্কার ও রং করা হয়েছিল। এরপর আর উল্লেখযোগ্য সংস্কারকাজ হয়নি। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতাধীন হওয়ায় মসজিদ কমিটিও নিজেদের উদ্যোগে বড় ধরনের সংস্কারকাজ করতে পারছে না।

বাবা আদম শহীদ (রহ.) মাজার ও মসজিদ কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আল আমিন দেওয়ান বলেন, ‘কালের সাক্ষী এই মসজিদটির বিভিন্ন অংশে ফাটল ও ক্ষতি হয়েছে। খুব দ্রুত এগুলো সংস্কার করা জরুরি। নয়তো ইসলামের এই ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন হারিয়ে যাবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights