সিগন্যাল মানছে না নাম্বার প্লেটহীন যান, এআই সুফল ব্যাহত

অনলাইন ডেস্ক
রাজধানীর বেশ কিছু এলাকায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর ট্রাফিক ক্যামেরা চালুর পর সড়ক ব্যবস্থাপনায় কিছুটা হলেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। লালবাতি অমান্য, লেন পরিবর্তন ও নির্ধারিত গতিসীমা লঙ্ঘন এআই ক্যামেরায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট গাড়ির মালিকদের ই-চালান (জরিমানা) পাঠানো হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এতে ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল ও বাসচালকদের মধ্যে ট্রাফিক আইন মানার প্রবণতা অনেকটা বেড়েছে।

তবে রাজধানীতে নাম্বার প্লেটহীন ব্যাটারিচালিত অবৈধ লাখো রিকশার কারণে এআই ট্রাফিক ক্যামেরার সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাচ্ছে না। এসব রিকশায় নাম্বার প্লেট না থাকায় ট্রাফিক আইন অমান্যের চিত্র এআই ক্যামেরায় শনাক্ত হলেও জরিমানা করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে রাজধানীর ব্যস্ত সড়ক ও মোড়ে যথেচ্ছ সিগন্যাল অমান্য, উল্টো পথে চলাচল এবং এলোমেলো রাস্তা পারাপার অব্যাহত আছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়ক বিশৃঙ্খল রেখে এআই দিয়ে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব না। কারণ এআই সড়কের বিশৃঙ্খলা দূর করতে পারে না, বরং একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাকে আরো সুশৃঙ্খল করতে কার্যকারিতা বাড়ায়।

গত সোমবার দুপুরে রাজধানীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের মোড়ে অবস্থান নিয়ে দেখা গেছে, লালবাতি জ্বলার পর অন্য যানবাহনের (মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি, বাস) চালকরা যান থামালেও নির্বিঘ্নে পার হয়ে যাচ্ছে নাম্বার প্লেটহীন আটোরিকশা। এআই ক্যামেরার আওতায় শাহবাগ মোড়ে ১০ মিনিটে অন্তত ২৫টি, বাংলামোটর সিগন্যালে ১৮টি অটোরিকশাকে সিগন্যাল অমান্য করে পার হয়ে যেতে দেখা গেছে।

মিরপুর চিড়িয়াখানা থেকে কেরানীগঞ্জের ফুলবাড়িয়াগামী ‘দিশারী’ পরিবহনের চালক সানাউল হোসেন হৃদয় বলেন, ‘ব্যাটারিচালিত রিকশার চালকরা কোনো নিয়মই মানছেন না। সিগন্যাল দেখে আমরা গাড়ি থামালেও রিকশাগুলো ইচ্ছা-খুশি মতো পার হয়ে যাচ্ছে। সিগন্যাল অমান্যের এসব ঘটনায় বিপরীত দিকের সিগন্যাল ছেড়ে দিলে কখনো জটলা আবার কখনো দুর্ঘটনা ঘটছে। এসব রিকশাচালক তো ট্রাফিক সিগন্যালই বোঝেন না।’

মোটরসাইকেলচালক মো. বিল্লাল বলেন, ‘ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়মের মধ্যে আনা না গেলে এআই ক্যামেরাসহ কোনো যন্ত্রই কাজে আসবে না।

মহল্লার সড়কে রিকশা চলুক, কিন্তু প্রধান সড়কে এসব অবৈধ রিকশা আসবে কেন? আমরা ট্যাক্স দিয়ে গাড়ি চালাই। ব্যাটারি রিকশার কারণে সড়কের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ছে।’
প্রধান সড়কে রিকশার বিশৃঙ্খল চলাচল নিয়ে ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষও। সায়েন্সল্যাব মোড়ে সবুজ মোল্লা নামের এক পথচারীর সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ফুট ওভারব্রিজে উঠে নীলক্ষেতের দিকে তাকালে যত দূর দেখবেন, শুধু রিকশা আর রিকশা। এ কারণে এই সড়কে সব সময় তীব্র যানজট লেগেই থাকে। এআই ক্যামেরা স্থাপনের পর সড়কে কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরলেও প্রতিদিন ব্যাটারিচালিত রিকশা যেহারে বাড়ছে, তাতে সুফল পাওয়া যাবে না বলে মনে হচ্ছে। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে এদিকটায় দ্রুত নজর দেওয়া জরুরি।’

কেন সিগন্যাল মানছেন না এবং মূল সড়কে চলে আসছেন, এমন প্রশ্নে অন্তত ১০ জন ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক কোনো মন্তব্য না করে এড়িয়ে যান। বিল্লাল নামের একজন রিকশাচালক বলেন, ‘খালি আমাগো নিয়া পইড়া আছেন ক্যা? দ্যাশে ক্যাডা নিয়ম মানে?’

ডিএমপি সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর ১৭টি সিগন্যালে বর্তমানে ৫০টি এআই ক্যামেরা চালু রয়েছে। ধীরে ধীরে এ সংখ্যা আরো বাড়ানো হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এআই ক্যামেরা মূলত যানবাহনের নাম্বার প্লেট শনাক্ত করে কেন্দ্রীয় সার্ভারে তথ্য পাঠায়। পরে ওই তথ্যের ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জরিমানার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

ট্রাফিক পুলিশ জানায়, রিকশার ট্রাফিক আইন ভঙ্গের ঘটনা ক্যামেরায় ধরা পড়লেও নাম্বার প্লেট না থাকায় তাদের বিরুদ্ধে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জরিমানা করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে রিকশা ডাম্পিং করা হচ্ছে।

শাহবাগ মোড়ে দায়িত্ব পালনরত সার্জেন্ট মো. মাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘হাইকোর্ট মাজার থেকে মৎস্য ভবন পর্যন্ত সিগন্যালে প্রায় ৭০ শতাংশই থাকে রিকশা। রিকশার কারণে সিগন্যালের সময় তিন মিনিটের জায়গায় পাঁচ মিনিট করতে হয়। রিকশাচালকরা সিগন্যাল বাতি না দেখে চলতে থাকেন। এতে অন্যদিকের গাড়িগুলোও সমস্যায় পড়ে।’

তিনি বলেন, ‘সবুজ সংকেতের পর হলুদ সংকেত জ্বলে তিন থেকে পাঁচ সেকেন্ড। এ সময় গাড়ির গতি কমিয়ে থামতে হয়। কিন্তু রিকশাচালকরা সিগন্যাল না মেনে চলতেই থাকেন। কখনো দ্রুতগতিতে যাওয়ার সময় হঠাৎ লালবাতি জ্বললে জোরে ব্রেক করে। রিকশার ব্রেক গাড়ির মতো নয়, ফলে যাত্রী উল্টে পড়ার ঘটনাও ঘটে। এমনকি রিকশা ফ্লাইওভারেও উঠে যায়।’

কারওয়ান বাজার সার্ক ফোয়ারা মোড়ে দায়িত্বে থাকা সার্জেন্ট অমিত চৌধুরী ও মো. সোহরাব হোসেন বলেন, ‘নাম্বার প্লেটবিহীন ধীরগতির যানবাহনের কারণে এআই ক্যামেরার সুফল ব্যাহত হচ্ছে। শুধু রিকশা নয়, সাধারণ মানুষও ট্রাফিক আইন না মেনে গাড়ি থামিয়ে রাস্তা পার হয়। এ পরিস্থিতি থেকে রক্ষায় ব্যাটারিচালিত নতুন রিকশা তৈরি বন্ধ করতে হবে।’

অটোরিকশা আমাদের গলার কাঁটা

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বলেন, ‘অটোরিকশা আমাদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অটোরিকশার সংখ্যা এত বেশি বাড়ছে যে আমরা এর সঙ্গে পেরে উঠছি না। এত রাস্তা, সে তুলনায় আমাদের লোকবল কম। গড়ে প্রতিদিন ৫০০ অটোরিকশা ডাম্পিং করা হচ্ছে। গত মাসে (জুলাই) ১৪ হাজারের বেশি অটোরিকশা ডাম্পিং করা হয়েছে। তাতেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না।’

তিনি বলেন, ‘এআই ক্যামেরার সুফল পেতে প্রধান সমস্যা রিকশা। বেশির ভাগ যানবাহনের নাম্বার প্লেট ক্যামেরায় শনাক্ত করা গেলেও অটোরিকশার ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে। তারা চারদিক থেকে সড়ক আটকে রাখে। আর এসব অটোরিকশার নাম্বার প্লেট নেই।’

নাম্বার প্লেটহীন যান চালকের বিরুদ্ধে এআই কার্যত অসহায়

পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শামসুল হক বলেন, ‘এআই ক্যামেরা কার্যকর করতে হলে আগে বৈধভাবে রেজিস্টার্ড গাড়ি ও বৈধ চালক নিশ্চিত করতে হবে। কারণ এআই রেজিস্ট্রেশন নম্বর ও ডেটাবেইসের ওপর নির্ভর করে। অথচ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বিপুলসংখ্যক অনিবন্ধিত গাড়ি, বিশেষ করে অটোরিকশা চলাচল করছে। ফলে তাদের বিরুদ্ধে প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’

তিনি বলেন, ‘ভিআইপি বা তুলনামূলক সুশৃঙ্খল সড়কে এআই কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে বলেই সুফল মিলছে। কিন্তু ঢাকার প্রকৃত সমস্যা বুঝতে মিরপুর, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা ও পুরান ঢাকার মতো এলাকায় যেতে হবে। বাসের পাল্টাপাল্টি, অবৈধ যানবাহন ও চালকের অনিয়ম এআই দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়। এআইকে সব সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখলে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।’

ড. শামসুল হক বলেন, ‘রাস্তা বিশৃঙ্খল রেখে যদি আমরা ভাবি, এআই এসে তা সুশৃঙ্খল করে দেবে—এই চিন্তা হিতে বিপরীত হবে। এআই কখনো বিশৃঙ্খল ব্যবস্থাকে সুশৃঙ্খল করতে পারে না। বরং একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাকে আরো সুশৃঙ্খল করতে সহায়তা করে।’

সূত্র : কালের কণ্ঠ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights