সিরিয়ায় অন্তর্বর্তী সরকার পরিচালনায় সাংবিধানিক ঘোষণাপত্র প্রস্তুত

সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমদ আল-শারা দেশের অন্তর্বর্তী সংবিধান প্রণয়নের জন্য সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। এই খসড়া সাংবিধানিক ঘোষণাপত্র দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসক বাশার আল-আসাদের পতনের পর দেশের অন্তর্বর্তী সরকার পরিচালনার রূপরেখা নির্ধারণ করবে।

বার্তা সংস্থা এপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিরিয়ায় ১৩ বছরের গৃহযুদ্ধ শেষে গত বছরের ৮ ডিসেম্বর বাশার আল-আসাদ পরিবারের পাঁচ দশকের দমনমূলক শাসনের অবসান ঘটে। এরপর দেশটির দায়িত্ব গ্রহণ করে বাশার আল-আসাদ বিরোধী গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল-শামের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহীরা। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই সিরিয়ার নতুন কর্তৃপক্ষ দেশ ও দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, “বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে, যেখানে একজন নারী সদস্যও রয়েছেন। এই কমিটির দায়িত্ব হবে অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য নিয়ন্ত্রক সাংবিধানিক ঘোষণাপত্রের খসড়া প্রস্তুত করা।”

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “কমিটি তাদের প্রস্তাব প্রেসিডেন্টের কাছে জমা দেবে।” তবে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমার উল্লেখ করা হয়নি।

বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করা বিদ্রোহী গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল-শামের প্রধান আহমদ আল-শারা জানুয়ারির শেষ দিকে অনির্দিষ্টকালের জন্য অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ পান। সিরিয়ার নতুন কর্তৃপক্ষ আসাদ আমলের সংবিধান বাতিল করেছে, এবং আহমদ আল-শারা জানিয়েছেন, নতুন সংবিধান প্রণয়নে তিন বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

জানুয়ারির শেষ দিকে, আহমদ আল-শারা একটি ‘সাংবিধানিক ঘোষণাপত্র’ প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দেন, যা অন্তর্বর্তী সময়ে দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে ‘আইনি ভিত্তি’ হিসেবে কাজ করবে। নতুন কমিটি ঘোষণার বিবৃতিতে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট কার্যালয় আরও জানিয়েছে,“সিরিয়ার জনগণের আইনের শাসনের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষা এবং সিরিয়ার জাতীয় সংলাপ সম্মেলনের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে এই ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সময়ের আইনি কাঠামো প্রস্তুতের লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।”

সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্যরা
১. আবদুল হামিদ আল-আওয়াক – তুরস্কের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সংবিধানিক আইনে ডক্টরেট ডিগ্রিধারী
2. ইয়াসির আল-হুয়াইশ – দামেস্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডিন
3. ইসমাইল আল-খালফান – আন্তর্জাতিক আইনের বিশেষজ্ঞ ও আলেপ্পো বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডিন
4. মোহাম্মদ রেদা জলখি – ইদলিব বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক আইনে ডক্টরেট ডিগ্রিধারী
5. বাহিয়া মারদিনি – কমিটির একমাত্র নারী সদস্য, পেশায় সাংবাদিক ও আইনে ডক্টরেট ডিগ্রিধারী, বর্তমানে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন

গত সপ্তাহের সংলাপ সম্মেলনের চূড়ান্ত ঘোষণায় বলা হয়, “একটি সাংবিধানিক কমিটি গঠন করা হবে, যা দেশের জন্য একটি স্থায়ী সংবিধানের খসড়া প্রস্তুত করবে, যাতে ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি হয়, ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা ও সাম্যের মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং আইন ও প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিতে একটি রাষ্ট্র গঠিত হয়।”

সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সংক্ষিপ্ত পটভূমি
সিরিয়ার সংঘাতের সূচনা হয় ২০১১ সালে। বাশার আল-আসাদ সরকারবিরোধী বিক্ষোভ কঠোর হাতে দমন করলে এটি গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। এতে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ নিহত হয়, কয়েক মিলিয়ন মানুষ দেশের ভেতরে ও বাইরে বাস্তুচ্যুত হয়, এবং সিরিয়ার অর্থনীতি, অবকাঠামো ও শিল্প খাত চরমভাবে বিপর্যস্ত হয়।

উল্লেখ্য, বাশার আল-আসাদের পতনের পর গত ডিসেম্বরে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এই সরকার আগামী ১ মার্চ পর্যন্ত দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে, এবং এরপর নতুন সরকার গঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights