সিলেটে পড়ালেখায় অনীহা, কমছে শিক্ষার হার

সিলেট ব্যুরো

সিলেটে দিনকে দিন কমছে শিক্ষার হার। মাধ্যমিক পর্যায়ে বাড়ছে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার সংখ্যা। নানা কারণে নিম্ন আয়ের পরিবারে শিশুদের পড়ালেখা নিয়ে অনীহা বেড়েছে। গেল ৬ বছরে সিলেট শিক্ষাবোর্ডে এসএসসি পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ২৫ শতাংশ।

শিক্ষাবীদরা বলছেন, পরীক্ষার্থীর সংখ্যা হ্রাসের এই হার উদ্বেগজনক। প্রাথমিকের গন্ডি পেরোনোর পর অনেক পরিবার তাদের শিশুদের লাগিয়ে দিচ্ছেন জীবিকা নির্বাহের কাজে। ঝরে পড়ারোধে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না গেলে ভবিষ্যতে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় বিপর্যয় নামতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

সিলেট শিক্ষাবোর্ডের তথ্যমতে, দেশে করোনার প্রকোপের পর থেকে কমতে থাকে এসএসসি পরীক্ষার্থীর সংখ্যা। ২০২১ সালে বোর্ডের অধীনে পরীক্ষার্থী ছিল ১ লাখ ১৯ হাজার ৫৫৩ জন। এরপর থেকে প্রতি বছর পরীক্ষার্থী কমতেই থাকে। ২০২৬ সালে এই সংখ্যা এসে দাঁড়ায় ৮৯ হাজার ৭৯ জনে। গেল ছয় বছরে পরীক্ষার্থী কমেছে ২৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ। অথচ এর আগের বছরগুলোতে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমবর্ধমান ছিল।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সারা দেশের মতো করোনার প্রকোপের সময় দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয়ে বড় ধাক্কা লাগে। লকডাউনের কারণে নিম্ন আয়ের মানুষ দীর্ঘদিন কর্মহীন ছিলেন। ধারদেনা করেই চলে তাদের দিন। করোনার ধাক্কা সামাল দেওয়ার আগেই ২০২২ সালে ভয়াবহ বন্যার মুখোমুখি হয় সিলেট। ওই সময় বন্যায় নিম্ন আয়ের মানুষ সর্বশান্ত হয়ে পড়েন। বানের পানিতে অনেকের ঘর ও গৃহপালিত পশু ভেসে যায়। অনেক শিক্ষার্থী শিক্ষাসামগ্রীও হারান।

এরপর ২০২৪ সালে আবারও বন্যার ধাক্কা লাগে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবন জীবিকায়। একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে পাথর কোয়ারি ও হাওরাঞ্চলের দরিদ্র লোকজন ধারদেনা, দাদন ও সুদের জালে জড়িয়ে পড়েন। দিন দিন আয় সংকোচিত হওয়া ও দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির কারণে ঋণের চক্র থেকে আর বেরুতে পারেননি তারা। ফলে অনেকেই তাদের সন্তানদের স্কুলের পরিবর্তে মাদ্রাসায় দিয়ে দেন। কেউ কেউ প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোনোর পর কৃষিকাজে দিয়ে দেন শিশুদের। মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়ার প্রবণতাও বেড়েছে। সবমিলিয়ে সিলেটে দিন দিন উচ্চ মাধ্যমিকে ঝরে পড়ার হার বৃদ্ধি পেতে থাকে।

এ প্রসঙ্গে সিলেট শিক্ষাবোর্ডের সচিব অধ্যাপক চৌধুরী মামুন আকবর জানান, গেল কয়েক বছরের প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির কারণে নিম্ন আয়ের মানুষের আর্থিক সংকট বেড়েছে। যে কারণে সিলেটের হাওরাঞ্চলসহ প্রত্যন্ত এলাকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিশুদের পড়ালেখা নিয়ে আগ্রহ কমেছে। স্কুলের পরিবর্তে তারা শিশুদের মাদ্রাসায় দিচ্ছে। প্রাথমিকের পর অনেকে শিশুদের কাজে লাগিয়ে দিচ্ছে। গার্মেন্টস ও কৃষিকাজে তারা যোগ দিচ্ছে। মধ্যবিত্ত পরিবারে ছেলেদের বিদেশ পাঠানোর প্রবণতাও বেড়েছে। যে কারণে গেল কয়েক বছর থেকে ধারাবাহিকভাবে এসএসসি পরীক্ষার্থী কমছে। এছাড়া সিলেটের প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্কুলগুলোর শিক্ষকের মান ও দক্ষতায় ঘাটতি রয়েছে। যে কারণে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল আসছে না।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. হিমাদ্রী শেখর রায় মনে করেন, সিলেটে ৬ বছরে এসএসসি পরীক্ষার্থী ২৫ ভাগ কমে যাওয়াটা উদ্বেগের। করোনা, বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে সিলেটের পশ্চাৎপদ জনপদের অনেক দরিদ্র পরিবারে আর্থিক সংকট প্রকট হয়েছে। শিক্ষার হার ও মান নিয়ে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকদের এখনই ভাবতে হবে। শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বসে এ থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে হবে।

মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, সিলেটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক মনে করেন, সিলেটে স্কুল পর্যায়ে ড্রপ আউটের পেছনে একক নয় বরং বহুবিধ কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ছেলেদের মধ্যে বিদেশমুখীতা ও মেয়েদের কম বয়সে বিয়ে দিয়ে দেওয়া। সিলেটের হাওর, চা-বাগান ও পাথর কোয়ারি এলাকার দরিদ্র জনগোষ্ঠি তাদের বাচ্চাদের পড়ালেখায় আগ্রহ হারাচ্ছে। এসব অঞ্চলে ঝরে পড়ার হার বেশি। এছাড়া সিলেটে মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও শিক্ষক সংকটও এবং অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতার অভাও দায়ী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights