সেমিকন্ডাক্টর শিল্প ও বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট

অনলাইন প্রতিবেদক

সেমিকন্ডাক্টর শিল্প আধুনিক ডিজিটাল অর্থনীতির অন্যতম মৌলিক ভিত্তি। এই খাত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং (HPC), পঞ্চম ও ষষ্ঠ প্রজন্মের (5G/6G) যোগাযোগব্যবস্থা, বৈদ্যুতিক যানবাহন (EV), নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং উন্নত ইলেকট্রনিক প্রযুক্তির বিকাশে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করছে। বিশ্বব্যাপী সেমিকন্ডাক্টরের ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে সঙ্গে এ শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহও কৌশলগত গুরুত্ব অর্জন করেছে। এ ক্ষেত্রে উচ্চ-শুদ্ধতার কোয়ার্টজ (HPQ) গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক কাঁচামাল, যা ধারাবাহিক পরিশোধন ও রূপান্তরের মাধ্যমে উচ্চ-শুদ্ধতার সিলিকা, মেটালার্জিক্যাল-গ্রেড সিলিকন (MG-Si), ইলেকট্রনিক-গ্রেড পলিসিলিকন, সিলিকন ওয়েফার এবং পরিশেষে সেমিকন্ডাক্টর চিপ উৎপাদনের ভ্যালু চেইনে প্রবেশ করে।

নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ। বাংলাদেশের নদীর বালুতে লুকিয়ে আছে মহামূল্যবান কোয়ার্টজ কণা। যা সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের বিপুল সম্ভাবনাময় উপকরণ। সরাসরি ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসের চিপ তৈরির কথা বলছি না, তবে আমরা আহরণ করতে পারি সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের কাঁচামাল কোয়ার্টজ। এখন পর্যন্ত গবেষণায় দেখা গেছে কাচ তৈরির জন্য বাংলাদেশের বালু যথেষ্ট ভালো। কিন্তু সেমিকন্ডাক্টরের জন্য প্রয়োজনীয় বিশুদ্ধতা এর আছে কি না, তা এখনো যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে যাচাই করা হয়নি।

চিপ তৈরিতে কোয়ার্টজ লাগে কেন?
প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি সেমিকন্ডাক্টর ডিভাইসে বর্তমানে সিলিকন ব্যবহার করা হয়। ২০২৪ সালে বিশ্বে চিপের বিক্রি ৬০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। ২০৩০ সালের আগেই এই বাজার ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়াবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সবকিছুর শুরু কোয়ার্টজ থেকে।

ধাপগুলো হলো: উচ্চ বিশুদ্ধতার কোয়ার্টজ থেকে উচ্চ বিশুদ্ধতার সিলিকা তৈরি হয়। এরপর তৈরি হয় মেটালার্জিক্যাল গ্রেড সিলিকন। এর বিশুদ্ধতা প্রায় ৯৮ থেকে ৯৯.৫ শতাংশ। এরপর তৈরি হয় ইলেকট্রনিক গ্রেড পলিসিলিকন। সেখান থেকে তৈরি হয় একক ক্রিস্টালের ইনগট। এরপর ওয়েফার এবং সবশেষে চিপ তৈরি হয়।

শুরুতে থাকা কোনো অশুদ্ধি পরের ধাপগুলোতেও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই কাঁচামালের মান পুরো প্রক্রিয়ার মানকে প্রভাবিত করে। ভালো মানের কোয়ার্টজের মজুত বিশ্বে খুব বেশি নেই। বাণিজ্যিক সরবরাহের বড় অংশ আসে যুক্তরাষ্ট্র, নরওয়ে, ব্রাজিল ও অস্ট্রেলিয়া থেকে। সেকারণে নতুন কোনো দেশ হিসেবে যুক্ত হতে পারে বাংলাদেশের নাম।

বালুর ও কোয়ার্টজের পরিমাণ
৮টি নদীতে ৩০০ বিলিয়ন টনের বেশি নদীর বালু রয়েছে। গবেষণার আওতাধীন এলাকা প্রায় ৫,৪৮১ বর্গকিলোমিটার। প্রতি বছর প্রায় ১ থেকে ১.৫ বিলিয়ন টন নতুন বালি জমা হয়। এ কারণে এটিকে কার্যত নবায়নযোগ্য খনিজ সম্পদ হিসেবে দেখা যেতে পারে। হালকা খনিজের প্রায় ৮৮.৭ শতাংশই কোয়ার্টজ। ভারী খনিজের পরিমাণ ওজনের হিসাবে ৮ থেকে ১৫ শতাংশ। এর মধ্যে রয়েছে ইলমেনাইট, জিরকন, রুটাইল, গারনেট ও মোনাজাইট। এসব ভারী খনিজ বর্জ্য নয়। এগুলো আলাদা পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। বালুর স্তর সাধারণত ৫ থেকে ৩০ মিটার পুরু। তাই এর উত্তোলন তুলনামূলকভাবে অগভীর এবং কম খরচের হতে পারে। বেশি সম্ভাবনাময় নদীগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, পদ্মা ও তিস্তা। ৬,৬০০টির বেশি নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮০০টির বেশি নমুনা বিশ্লেষণ করেছি আমরা।

বড় সমস্যা বিশুদ্ধতা
এখন পর্যন্ত যা প্রমাণিত হয়েছে, তা হলো ফ্লোটেশন পদ্ধতিতে প্রায় ৯৯.৫ শতাংশ SiO₂ বিশুদ্ধতার কোয়ার্টজ কনসেনট্রেট পাওয়া যায়। এটি কাচ এবং বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহারের জন্য যথেষ্ট ভালো।
কিন্তু সেমিকন্ডাক্টরের জন্য আরও বেশি বিশুদ্ধতা প্রয়োজন। সাধারণত ৯৯.৯৯ থেকে ৯৯.৯৯৭ শতাংশ SiO₂ দরকার হতে পারে।

লোহা, অ্যালুমিনিয়াম, টাইটানিয়াম, লিথিয়াম, সোডিয়াম ও বোরনের মতো উপাদানের পরিমাণও খুব কম থাকতে হবে। ক্রিস্টালের ত্রুটিও প্রায় থাকতে পারবে না। পরবর্তী ধাপে ইলেকট্রনিক গ্রেড পলিসিলিকনের বিশুদ্ধতা আরও অনেক বেশি দরকার। এটি প্রায় ৯৯.৯৯৯৯৯৯৯ শতাংশ বা 9N পর্যায়ের।

বাংলাদেশের বালুর ক্ষেত্রে এখনো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়নি। এর মধ্যে রয়েছে অতি ক্ষুদ্র অশুদ্ধির পরীক্ষা, ক্রিস্টাল কাঠামো বিশ্লেষণ এবং বড় পরিসরে বিশুদ্ধকরণ পরীক্ষা। কাচ তৈরির উপযোগী সিলিকা আর সেমিকন্ডাক্টর গ্রেড কোয়ার্টজ ভিন্ন জিনিস। যেহেতু এখনও বাংলাদেশি বালুর ওপর এসব পরীক্ষা করা হয়নি – সেহেতু বাংলাদেশের সম্ভাবনা থাকার পরও এটি নিয়ে বাস্তবসম্মত থাকার পরামর্শ থাকবে।

যেখানে বেশি মূল্য পাওয়া যায়
সেমিকন্ডাক্টর উপকরণ কোয়ার্টজ ও পলিসিলিকনের বড় উৎপাদক দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে চীন, জাপান, জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশের জন্য এই খাতটি তুলনামূলকভাবে বাস্তবসম্মত হতে পারে। কারণ এর ভিত্তি হবে দেশের নিজস্ব খনিজ সম্পদ। আরেকটি সম্ভাবনা হলো অ্যাসেম্বলি, প্যাকেজিং ও টেস্টিং। এই খাতকে OSAT বা Outsourced Semiconductor Assembly and Test বলা হয়।

তাইওয়ান, মালয়েশিয়া, চীন, সিঙ্গাপুর ও ফিলিপাইন এই খাতে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশও এখানে সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তুলনামূলক সস্তা শ্রম একটি সুবিধা হতে পারে। IC ডিজাইনও একটি সম্ভাবনাময় খাত। এই খাতে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে আছে। তবে এখানে বড় মূলধনের চেয়ে দক্ষ জনবল বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে ওয়েফার তৈরি এবং চিপ তৈরির কারখানার সরঞ্জাম উৎপাদন অনেক বেশি কঠিন। এই খাতে তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, নেদারল্যান্ডস, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে। বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান থেকে এই খাতে প্রতিযোগিতা করা কঠিন।

সহায়ক বিশ্লেষণ ও সুপারিশ
খুব দ্রুত ওয়েফার ফ্যাব বা চিপ তৈরির কারখানায় যাওয়া হয়ত সম্ভব নয়। এর জন্য বিপুল মূলধন দরকার। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় শিল্প অবকাঠামো ও সরবরাহ ব্যবস্থাও এখনো বাংলাদেশে গড়ে ওঠেনি। এর বদলে নজর দেওয়া যায় উচ্চ বিশুদ্ধতার সিলিকা, বিশেষ ধরনের কাচ, অপটিক্যাল ফাইবারের উপকরণ, সেমিকন্ডাক্টর কাঁচামাল, IC ডিজাইন এবং OSAT খাতে।

বর্তমানে বিশ্বে দ্রুত বাড়তে থাকা উৎপাদন খাতগুলোর একটি হলো OSAT। এর মধ্যে চিপের অ্যাসেম্বলি, প্যাকেজিং ও টেস্টিং করা হয়। এই পথের সুবিধা হলো, এখানে দেশের বিদ্যমান সম্পদ ও সক্ষমতা কাজে লাগানো যায়। ওয়েফার ফ্যাবের মতো বিপুল বিনিয়োগ বা অত্যাধুনিক ক্লিনরুম অবকাঠামোও শুরুতেই দরকার পড়ে না।

রোডম্যাপ: ২০২৬ থেকে ২০৫০
২০২৬ থেকে ২০৩০: খনিজ সম্পদের ম্যাপিং শেষ করা। পরীক্ষামূলক বিশুদ্ধকরণ কারখানা চালু করা। গবেষণা ও উন্নয়ন এবং প্রশিক্ষণ শুরু করা।

২০৩১ থেকে ২০৩৫: বছরে ১,০০০ টনের বেশি HPQ উৎপাদনে যাওয়া। বিশেষ ধরনের সিলিকা ও কাচের কারখানা চালু করা। IC ডিজাইনের সক্ষমতা তৈরি করা।

২০৩৬ থেকে ২০৪০: বছরে ৫,০০০ টনের বেশি HPQ ও সিলিকা উৎপাদন করা। ২০০ থেকে ৩০০ মিলিমিটার আকারের ওয়েফার নিয়ে পরীক্ষামূলক ফ্যাব স্থাপন করা। উন্নত প্যাকেজিংয়ের পাইলট প্রকল্প চালু করা।

২০৪১ থেকে ২০৪৫: বাণিজ্যিক ওয়েফার ফ্যাব চালু করা। ডিজাইন, অ্যাসেম্বলি ও টেস্টিংয়ের জন্য আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার চেষ্টা করা।

২০৪৬ থেকে ২০৫০: বছরে ১৫,০০০ টনের বেশি উৎপাদনে যাওয়া। কাঁচামাল থেকে শুরু করে চূড়ান্ত পণ্য পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প ব্যবস্থা তৈরি করা।

নীতি গঠনে সুপারিশ
প্রথমত, জাতীয় পর্যায়ে HPQ অনুসন্ধান কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। এতে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী খনিজের বৈশিষ্ট্য এবং অতি ক্ষুদ্র অশুদ্ধি পরীক্ষা করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, একটি Sand Processing and Research Centre তৈরি করা যেতে পারে। সেখানে পরীক্ষামূলক পর্যায়ে খনিজ পৃথকীকরণ, বিশুদ্ধকরণ ও পরীক্ষা করার সুবিধা থাকবে।

তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেমিকন্ডাক্টর উপকরণ, VLSI ডিজাইন, খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ইলেকট্রনিকস নিয়ে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ চালু করা প্রয়োজন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের সুযোগ বাড়াতে হবে।

চতুর্থত, শুরুতেই ওয়েফার ফ্যাবের দিকে না গিয়ে ডাউনস্ট্রিম পণ্যে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এর মধ্যে রয়েছে বিশেষ ধরনের কাচ, অপটিক্যাল ফাইবার, সৌরবিদ্যুৎ বা PV উপকরণ, IC ডিজাইন এবং OSAT।

পঞ্চমত, একটি জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর রোডম্যাপ তৈরি করা দরকার। এতে বিনিয়োগ সুবিধা, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব, পরিবেশ সুরক্ষা এবং খনিজ সম্পদ ব্যবস্থাপনার নীতি থাকবে।

এখন যা হচ্ছে
বাংলাদেশে একটি National Semiconductor Taskforce গঠন করা হয়েছে। BIDA ২০২৫ সালে IC ডিজাইন, VLSI, প্যাকেজিং, টেস্টিং এবং উন্নত ইলেকট্রনিকসকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।

বিশ্ব পর্যায়েও সেমিকন্ডাক্টরের গুরুত্ব বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের CHIPS Act এবং ইউরোপের Chips Act সেমিকন্ডাক্টরকে শুধু বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে দেখছে না। জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও বিষয়টি এখন যুক্ত। এ কারণেই নতুন কাঁচামালের উৎস খোঁজার প্রতিযোগিতা বাড়ছে।

নিকট ভবিষ্যতের সুযোগ মূলত ইলেকট্রনিকস নয়। বরং বাংলাদেশের জন্য সুযোগ রয়েছে খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণে।

খনিজ পৃথকীকরণ, বিশুদ্ধকরণ এবং বিশেষ ধরনের কাচ উৎপাদন মূলত রাসায়নিক ও খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণভিত্তিক কাজ। এসব খাত বাংলাদেশের বিদ্যমান সক্ষমতার সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
একইসাথে ভারী খনিজগুলোকেও গুরুত্ব দেওয়া দরকার।

মোট বালুর ওজনের ৮ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ভারী খনিজ থাকতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে জিরকন, ইলমেনাইট, রুটাইল, গারনেট ও মোনাজাইট। বাংলাদেশ অতিরিক্ত রাজস্ব ও শিল্পমূল্য তৈরি করতে চাইলে এই খনিজগুলোও আলাদা করে প্রক্রিয়াজাত করতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights