সৌদির সামনে ‌‘হুথি-বিপদ’

অনলাইন ডেস্ক
বিশ্বের জ্বালানি তেলের বাজারে চরম অস্থিরতার মাঝে সৌদি আরব তেল রপ্তানি সচল রাখতে যে বিকল্প পথটি বেছে নিয়েছিল, সেটিও এখন গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। হরমুজ প্রণালীর অচলাবস্থা এড়াতে সৌদি আরব গত কয়েক সপ্তাহ ধরে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের মাধ্যমে লাখ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল সরবরাহ শুরু করেছিল। তবে ইয়েমেনের ইরান-পন্থি হুথি বিদ্রোহীরা সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ায় এই নতুন করিডোরটিও এখন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এতে করে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম আরও আকাশচুম্বী হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এনার্জি অ্যাসপেক্টসের ভূ-রাজনীতি বিষয়ক প্রধান রিচার্ড ব্রোঞ্জ জানিয়েছেন, লোহিত সাগর দিয়ে সৌদি তেলের প্রবাহে যেকোনো ধরনের বাধা বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করবে। গত দুই সপ্তাহে ইয়ানবু বন্দর দিয়ে দৈনিক গড়ে ৪৬ লাখ ব্যারেল তেল জাহাজে তোলা হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি। হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজার যে দৈনিক ১ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল তেলের সংকটে ভুগছে, সেই তুলনায় ইয়ানবুর এই সরবরাহ সামান্য হলেও এটি বর্তমান পরিস্থিতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বলে পরিচিত বাব আল-মান্দেব প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ এখন উদ্বেগের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকেই গাজা যুদ্ধের প্রতিবাদে এই পথে বাণিজ্যিক জাহাজে আক্রমণ করে আসছিল হুথিরা। কিন্তু সম্প্রতি ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি সরাসরি যুদ্ধে যোগ দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে পড়েছে। গত মার্চ মাসে এই প্রণালী দিয়ে তেলবাহী জাহাজের চলাচল ফেব্রুয়ারির তুলনায় ২১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে বর্তমানে প্রতি ব্যারেল ১১০ ডলারে লেনদেন হচ্ছে। রিস্তাদ এনার্জির তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস বিষয়ক প্রধান আরতেম আব্রামভ সতর্ক করেছেন যে যদি বাব আল-মান্দেব প্রণালীটি ট্যাঙ্কার চলাচলের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, তবে আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর ফলে বিমা খরচ ও জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহের পুরো ব্যবস্থাটি ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

হুথি সরকার ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছে, বাব আল-মান্দেব প্রণালী বন্ধ করে দেওয়া তাদের জন্য একটি কার্যকরী বিকল্প এবং এর পরিণতির জন্য তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করবে। তাদের কাছে থাকা ড্রোন এবং জাহাজ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এই নৌপথের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই হুমকির মুখে ইয়ানবু বন্দর থেকে ছেড়ে আসা তেলবাহী জাহাজগুলোকে যদি বিকল্প পথে গন্তব্যে যেতে হয়, তবে তাদের সুয়েজ খাল হয়ে পুরো আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে ভারত মহাসাগরে পৌঁছাতে হবে, যা সমুদ্র যাত্রায় কয়েক সপ্তাহ সময় বাড়িয়ে দেবে।

এই জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার হতে যাচ্ছে এশিয়া অঞ্চল। এশিয়ার দেশগুলো তাদের প্রয়োজনীয় তেলের প্রায় ৬০ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। বর্তমান সংকটের কারণে অনেক দেশ ইতিমধ্যে জ্বালানি সাশ্রয়ের কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ফিলিপাইন জ্বালানি খাতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে এবং সরকারি কর্মচারীদের কাজের সময় কমিয়ে চার দিনে নিয়ে এসেছে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার তাদের নাগরিকদের পানির ব্যবহার কমিয়ে কম সময়ে গোসল করার পরামর্শ দিয়েছে।

ট্রেড ডাটা বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্যমতে, চলতি মাসে ইয়ানবু বন্দর থেকে আসা প্রায় সব তেলই এশিয়ার দেশগুলোর জন্য বরাদ্দ ছিল। হুথির হামলার আশঙ্কায় যদি এই রুট বন্ধ হয়ে যায়, তবে সৌদি আরব এশিয়ায় তেল পাঠানো কমিয়ে ইউরোপের নিকটবর্তী দেশগুলোতে সরবরাহের অগ্রাধিকার দিতে পারে। এর ফলে এপ্রিলে এশিয়ার অনেক দেশেই অপরিশোধিত তেলের তীব্র সংকট দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মজুত করা তেলের পরিমাণও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলবে।

বিশ্লেষকদের মতে, তেলের উচ্চমূল্য একটি বড় সমস্যা হলেও বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা। এশিয়ার অনেক দেশ এখন চড়া দাম দিয়েও পর্যাপ্ত জ্বালানি খুঁজে পাচ্ছে না। যদি লোহিত সাগরের এই বিকল্প পথটি শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়, তবে তা কেবল জ্বালানি সংকট নয় বরং বিশ্ব অর্থনীতির ওপর এক বিশাল নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সরবরাহ সংকটের এই তীব্রতা সামনের দিনগুলোতে বিশ্বজুড়ে স্থানীয় পর্যায়ে জ্বালানি তেলের হাহাকার তৈরি করতে পারে।

সিএনএনের বিশ্লেষণ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights