সৌদি কি সত্যিই পাকিস্তানের জন্য সামরিক পদক্ষেপে যাবে?

অনলাইন ডেস্ক

দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের সূচনা ঘটিয়ে পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং তুরস্কের মধ্যে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়েছে। চুক্তিটির মূল কথা হলো, জোটভুক্ত যেকোনো একটি দেশের ওপর সামরিক হামলা হলে তা তিনটি দেশের ওপরই হামলা হিসেবে গণ্য হবে। কাগজে কলমে এটিকে একটি প্রতিরক্ষামূলক ও সম্মিলিত নিরাপত্তার কাঠামো হিসেবে বর্ণনা করা হলেও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকদের কাছে এটি এক নতুন কূটনৈতিক ধোঁয়াশার জন্ম দিয়েছে। মূল প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, সংকটকালে এই কৌশলগত প্রতিশ্রুতি কি সত্যিই সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপে রূপান্তরিত হবে, নাকি তা কেবল রাজনৈতিক সংহতি, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ এবং লজিস্টিক সহায়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে?

এই চুক্তির আসল গভীরতা বুঝতে হলে এটিকে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের বহু বছরের প্রতিরক্ষা সম্পর্কের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখতে হবে, যা ২০২৫ সালে একটি আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিপক্ষীয় রূপ নিয়েছিল। কিন্তু ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, কৌশলগত চুক্তি বা সামরিক সুসম্পর্ক থাকলেই সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তার গ্যারান্টি পাওয়া যায় না। পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে দশকের পর দশক ধরে ঘনিষ্ঠ সামরিক যোগাযোগ রয়েছে এবং বহু বছর ধরে সৌদি ভূখণ্ডে পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন রয়েছে।

তা সত্ত্বেও আঞ্চলিক সশস্ত্র সংঘাতের ক্ষেত্রে পাকিস্তান সবসময়ই একটি সতর্ক দূরত্ব বজায় রেখেছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৫ সালে যখন সৌদি আরবের নেতৃত্বে ইয়েমেনে সামরিক অভিযান শুরু হয়, তখন পাকিস্তানের পার্লামেন্ট সে দেশে সেনা পাঠানো বা সরাসরি সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার প্রস্তাব খারিজ করে দিয়েছিল। এতে স্পষ্ট হয় যে, জাতীয় স্বার্থ, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে প্রতিটি রাষ্ট্রই নিজেদের সামরিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত হিসাব-নিকাশ করে চলে।

সম্প্রতি এই দ্বিপক্ষীয় জোটে তুরস্ক যুক্ত হওয়ায় একটি নতুন ত্রিপক্ষীয় মাত্রা তৈরি হয়েছে। অনেকে একে রূপক অর্থে একটি ইসলামিক ন্যাটো বা সুন্নি নিরাপত্তা বলয় বলে অভিহিত করলেও এটি একটি জটিল ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার অতিসরলীকরণ মাত্র। কারণ এই তিন দেশের প্রধান নিরাপত্তা হুমকি ও ভৌগোলিক গুরুত্বের ক্ষেত্রগুলো সম্পূর্ণ আলাদা। পাকিস্তানের সমস্ত কৌশলগত মনোযোগ কেন্দ্রীভূত দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর।

অন্যদিকে তুরস্ক ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক থিয়েটারে নিজস্ব প্রভাব বিস্তারে ব্যস্ত। আবার সৌদি আরবের মূল নিরাপত্তা উদ্বেগ হলো পারস্য উপসাগরের স্থিতিশীলতা রক্ষা, নিজের তেল অবকাঠামোর সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং ইরান সমর্থিত আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোর হামলা মোকাবিলা করা। সম্প্রতি সৌদি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একাধিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখোমুখি হওয়ায় রিয়াদ প্রথাগত পশ্চিমা নিরাপত্তা বলয়ের বাইরে গিয়ে তাদের সামরিক অংশীদারত্বকে বহুমুখী করার তাগিদ অনুভব করছে।

ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে, এই চুক্তি দিল্লির নিরাপত্তার জন্য নিশ্চিতভাবেই একটি বাড়তি কৌশলগত জটিলতা তৈরি করে। পাকিস্তান এখন দুটি প্রধান আঞ্চলিক শক্তির আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সমর্থন লাভ করল। যুদ্ধক্ষেত্রে সৌদি আরব বা তুরস্কের সরাসরি সৈন্য পাঠানোর সম্ভাবনা কম হলেও কোনো সম্ভাব্য সংকটের সময় ইসলামাবাদ রিয়াদ বা আঙ্কারা থেকে কূটনৈতিক সমর্থন, গোয়েন্দা তথ্য, আধুনিক সামরিক প্রযুক্তি এবং লজিস্টিক সহযোগিতা পেতে পারে।

তবে এর বিপরীতে সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক বাধাটি সৃষ্টি করে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক বাস্তবতা। সৌদি আরব তাদের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক রূপান্তরের অংশ হিসেবে ভারতের মতো বৃহৎ অর্থনীতির সাথে গভীর ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। ভারতের বিশাল জ্বালানি বাজার এবং সেখানে সৌদি পুঁজির ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ রিয়াদের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রিয়াদ কখনোই চাইবে না এমন কোনো কঠোর সামরিক অবস্থানের দিকে যেতে, যা নয়াদিল্লির সঙ্গে তাদের সুদৃঢ় বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে চিরতরে বিনষ্ট করে। ২০২৫ সালের পাহালগাম সন্ত্রাসী হামলা এবং ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর প্রেক্ষাপটে ভারত-পাকিস্তান সামরিক উত্তেজনার সময়েও সৌদি আরব পাকিস্তানের পক্ষে সরাসরি কোনো সামরিক বা উস্কানিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত থেকে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখেছিল।

মক্কা চুক্তিকে কোনো চূড়ান্ত সামরিক জোট হিসেবে দেখার সুযোগ যেমন নেই, তেমনি একে কেবল একটি রাজনৈতিক অনুষ্ঠান হিসেবে উড়িয়ে দেওয়াও সমীচীন হবে না। এটি মূলত পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার একটি প্রতিফলন, যেখানে রিয়াদ কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন খুঁজছে, আঙ্কারা তার আঞ্চলিক প্রভাব বাড়াতে চাইছে এবং ইসলামাবাদ নিজেদের নিরাপত্তা সহযোগীদের ক্ষেত্র বিস্তৃত করছে।

সূত্র: এনডিটিভি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights