স্কালোনির কাছে অনুশীলনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব যে ‘রীতির’

অনলাইন ডেস্ক

স্পেনের বিপক্ষে বিশ্বকাপের ফাইনাল আজ মাঠে নামবে আর্জেন্টিনা। যে ম্যাচের আগে আর্জেন্টিনা দল আরও একবার তাদের চিরচেনা প্রথাগত ভোজের আয়োজন করে। বর্তমান কোচিং স্টাফ দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই দলের মেলবন্ধন তৈরিতে এই বিশেষ ভোজন আয়োজন করা হচ্ছে। যা এক রীতিতে পরিনত হয়েছে। সেটির গুরুত্ব আর্জেন্টাইন কোচের কাছে দলের অনুশীলনের চাইতেও না কি বেশি।

কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে লিওনেল স্কালোনি ব্যাখ্যা করেছিলেন, ‘আমরা আপনাদের বারবার বলতে ক্লান্তি বোধ করব না যে, এগুলো নিঃসন্দেহে সবচেয়ে সেরা মুহূর্ত। অবশ্যই এটিও মিশরের বিপক্ষে জয়ের পর উদযাপনের মুহূর্তগুলোর মতোই। এগুলো অনন্য মুহূর্ত, যা জীবনে আর কখনও ফিরে আসবে না।’

কোচ যে মুহূর্তগুলোর কথা বলছিলেন, তার সঙ্গে মাঠের পারফরম্যান্স কিংবা আর্জেন্টিনা দলের সফলতার সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। বরং এটি আর্জেন্টিনার নিজস্ব এক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। যা দলের খেলোয়াড়দের ঐক্যবদ্ধ করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। তা হলো প্রতি সপ্তাহের ‘আসাদো’ (বার্বিকিউ বা মাংস পোড়ানোর উৎসব)।

আলবিসেলেস্তেদের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই স্কালোনির পুরো মেয়াদে এই প্রথা নিয়মিত পালন করা হচ্ছে। এমনকি বিশ্বকাপের মতো বড় টুর্নামেন্ট চলাকালেও এটি কোনো সপ্তাহে বাদ যায়নি।

এবারের বিশ্বকাপেও স্কোয়াডের খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ এবং আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ) সভাপতি ক্লাউদিও তাপিয়া বেশ কয়েকবার এই আসাদোর আনন্দ ভাগাভাগি করেছেন।

তাপিয়া প্রায়ই তার সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ভোজের ভেতরের মুহূর্তগুলো শেয়ার করেন। গত শুক্রবারের রাতটিও এর ব্যতিক্রম ছিল না। তবে এবারের আসাদো ছিল একটু বিশেষ। কারণ আগামীকাল রাতে ১টায় মেটলাইফ স্টেডিয়ামে স্পেনের বিরুদ্ধে ফাইনালের মুখোমুখি হওয়ার আগে এটাই ছিল তাদের শেষ ভোজ।

আর্জেন্টাইন ফুটবল প্রধান তাঁর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে একটি ভিডিওর ক্যাপশনে লিখেছেন, ‘হাড় মজ্জায় আর্জেন্টাইন। হ্যাঁ, পুরো দলের সঙ্গে আসাদো হয়ে গেল।’ ভিডিওটিতে সেই বিশেষ মুহূর্তের আমেজ ফুটে উঠেছে।

কোচ স্কালোনি জানান, ফুটবল থেকে খেলোয়াড় হিসেবে অবসর নেওয়ার পরও কেন তিনি ফুটবলের সাথেই জড়িয়ে রইলেন, তার কারণ এটাই, ‘সেদিন সংবাদ সম্মেলনে বসে আমি বলেছিলাম, আমি এই দলগত পরিবেশটার জন্যই আজ কোচ। ৪-৩-৩ ফর্মেশনের প্রতি ভালোবাসার জন্য নয়। আমি দলবদ্ধভাবে থাকা, সতীর্থদের সান্নিধ্য পাওয়া, আসাদো খাওয়া আর ট্রুকো (আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী তাস খেলা) খেলা উপভোগ করি। যা আমরা সারা জীবন ধরে করে এসেছি।’

এটি কেবল সাধারণ কোনো খাওয়া-দাওয়া নয়। আসাদো এখন দলের সবার জন্য সপ্তাহের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত মুহূর্ত হয়ে উঠেছে। এমনকি স্কালোনি অনুশীলনের চেয়েও এটিকে বেশি গুরুত্ব দেন। কারণ তিনি মনে করেন, এটি সবার একসঙ্গে থাকার পরিবেশকে আরও সহজ করে এবং পারস্পরিক সম্পর্ককে মজবুত করে।

সান্তাফের এই কোচ ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘আমরা আসাদো খাওয়ার জন্য কিছু অনুশীলনের সময়ও কমিয়ে দিয়েছি। এগুলোকে আমরা অনেক মূল্যবান মনে করি। হয়ত অন্য মানুষের কাছে এর কোনো গুরুত্ব নেই। কিংবা তারা মনে করে কেবল মাঠের খেলাই শেষ কথা। কিন্তু ভবিষ্যৎ জীবনে তারা এই দিনগুলো মনে রাখবে।’

‘১৯৯৭ সালের মালয়েশিয়ার (অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ) স্মৃতি এখনও আমার চোখে ভাসে। সেখানে পাবলো (আইমার) ও ওয়াল্টার (সামুয়েল) আমার সঙ্গে ছিল। কারণ আমরা একসঙ্গে দারুণ কিছু মুহূর্ত কাটিয়েছিলাম। যেকোনো ফলাফলের ঊর্ধ্বে, এগুলোই মানুষ সঙ্গে করে নিয়ে যায়। এগুলো অবিস্মরণীয় মুহূর্ত, আমরা এই বিষয়গুলোর ওপর অনেক জোর দিই কারণ এটি দল গঠন করে, আর দল হিসেবে এক হতে পারলে আমরা আরও বেশি শক্তিশালী।

৪৮ বছর বয়সী এই কোচ তাঁর বর্তমান অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজের খেলোয়াড়ী জীবনের তুলনা করে বলেন, ‘আমি সবসময়ই দলে সবাইকে একসঙ্গে রাখার কাজটা করতাম। আমি কখনোই খুব বড় মাপের খেলোয়াড় ছিলাম না। আর সে কারণেই হয়তো আমাকে বিশ্বকাপে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আমি এমন সব ক্লাবে খেলেছি যেখানে তারা আমাকে দলে নিত, কারণ আমি একজন ভালো মানুষ ছিলাম, ভালো খেলতাম বলে নয়।’

যে আর্জেন্টিনা দল তাদের শক্তির মূল ভিত্তি হিসেবে গড়ে তুলেছে ঐক্যকে, সেখানে এই ‘আসাদো’ কেবল একবেলার সাধারণ খাওয়া-দাওয়া নয়, বরং স্কালোনির প্রজেক্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

আর্জেন্টিনা যখন বিশ্বকাপে আরও একবার ইতিহাস গড়ার লক্ষ্যে স্পেনের মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন কোচ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে কৌশল বা স্ট্র্যাটেজির পাশাপাশি গ্রিলের চারপাশে আড্ডা, গল্প আর হাসাহাসির এই মুহূর্তগুলোর মূল্য যেকোনো ক্রীড়াক্ষেত্রের ফলাফলের চেয়ে অনেক বেশি স্থায়ী হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights