স্তন ক্যানসারের এমআরএনএ ভ্যাকসিন উদ্ভাবনে জোর দিচ্ছেন ইরানি বিজ্ঞানীরা

অনলাইন ডেস্ক
স্তন ক্যানসারের টিউমারের বৃদ্ধি ও শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে সক্ষম হতে পারে- এমন একটি সম্ভাব্য এমআরএনএ টিকার নকশা তৈরি করেছেন ইরানের গবেষকরা।

ইরানের প্রেসটিভি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, দেশটির পাঁচটি বৈজ্ঞানিক ও চিকিৎসা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষকদের যৌথ উদ্যোগে তৈরি এই সম্ভাব্য টিকা এখনো পরীক্ষাগারে বা মানুষের ওপর পরীক্ষা করা হয়নি; এটি আপাতত কম্পিউটারভিত্তিক গবেষণা পর্যায়ে রয়েছে। তবে গবেষকরা বলছেন, ক্যানসারের বিরুদ্ধে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের লক্ষ্যভিত্তিক টিকা তৈরির ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিশ্বে স্তন ক্যানসারে ৬ লাখ ৭০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ১৫৭টি দেশে নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হওয়া ক্যানসারও এটি।

বর্তমানে স্তন ক্যানসারের চিকিৎসায় কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি ও অস্ত্রোপচার ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হলেও এসব পদ্ধতিতে অনেক সময় সুস্থ কোষও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয় এবং কিছু ক্ষেত্রে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ওই চিকিৎসার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি করতে পারে।

এসব সীমাবদ্ধতার কারণে ইমিউনোথেরাপির প্রতি চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের আগ্রহ বাড়ছে। এই পদ্ধতিতে শরীরের ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ক্যান্সারের কোষ চিনে তা ধ্বংস করার জন্য প্রস্তুত করা হয়, যার ফলে চারপাশের সুস্থ কোষের ক্ষতি কম হয়।

তেহরান ইউনিভার্সিটি অব মেডিকেল সায়েন্সেস, সেমনান ইউনিভার্সিটি অব মেডিকেল সায়েন্সেস, রাজি ভ্যাকসিন অ্যান্ড সিরাম রিসার্চ ইনস্টিটিউট, পাস্তুর ইনস্টিটিউট অব ইরান এবং মোতামেদ ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের একদল গবেষক যৌথভাবে এই এমআরএনএ টিকার নকশা তৈরি করেছেন। টিকাটি একইসঙ্গে টিউমারের বেঁচে থাকা এবং ছড়িয়ে পড়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী দুটি প্রোটিনকে লক্ষ্য করে কাজ করবে। এগুলো হল- ভিইজিএফআর২ এবং সি-এমইটি।

‘ভিইজিএফআর২’ প্রোটিনটি ‘অ্যানজিওজেনেসিস’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে টিউমারকে নতুন রক্তনালী তৈরি করতে সাহায্য করে, যার ফলে ক্যান্সার কোষগুলো পুষ্টি পায় এবং বাড়তে থাকে। অন্যদিকে, ‘সি-এমইটি’ প্রোটিনটি টিউমারের বৃদ্ধি, বেঁচে থাকা এবং মেটাস্ট্যাসিসকে (শরীরের অন্যান্য অংশে ক্যান্সার কোষ ছড়িয়ে পড়া) ত্বরান্বিত করে।

গবেষকদের মতে, এই দুই প্রোটিনের বিরুদ্ধে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় করা গেলে টিউমারের রক্ত সরবরাহ ব্যাহত করার পাশাপাশি ক্যানসার কোষের বিস্তারও কমানো সম্ভব হতে পারে। ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার আগে টিকাটি কীভাবে কাজ করবে, তা অনুমান করতে গবেষকরা ইমিউনোইনফরমেটিক্স-ভিত্তিক পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। এর মধ্যে ছিল কম্পিউটেশনাল মডেলিং এবং জেনেটিক ডেটাবেসের ব্যবহার।

প্রচলিত টিকা তৈরির প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত জৈবিক নমুনা এবং প্রাণীদেহে ব্যাপক পরীক্ষার প্রয়োজন হয়। তবে, এই ইন-সিলিকো (কম্পিউটার সিমুলেশন) পদ্ধতির সাহায্যে বিজ্ঞানীরা আধুনিক কম্পিউটার প্রযুক্তির মাধ্যমে টিকার কার্যকারিতা মূল্যায়ন করতে সক্ষম হয়েছেন।

একটি কার্যকর ইমিউন রেসপন্স বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে গবেষক দল নির্দিষ্ট প্রোটিনের অংশ চিহ্নিত করেন, যা এপিটোপ নামে পরিচিত। এগুলোকে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সহজে চিনতে পারে। ১২ ধাপের স্ক্রিনিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হাজার হাজার প্রোটিন অংশ বিশ্লেষণ করা হয় এবং টিকার চূড়ান্ত নকশার জন্য ১০টি এপিটোপ নির্বাচন করা হয়।

‘ইন্টারন্যাশনাল ইমিউনোফার্মাকোলজি’ জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণার ফলাফল অনুসারে, টিকাটি দীর্ঘমেয়াদী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে শক্তিশালী সম্ভাবনা দেখিয়েছে। কম্পিউটার সিমুলেশনে দেখা গেছে, এটি শরীরে সুরক্ষামূলক অ্যান্টিবডি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়েছে এবং ইমিউন মেমোরি কোষকে সক্রিয় করেছে, যা টিউমারের ফিরে আসা রোধ করতে অত্যন্ত জরুরি।

কম্পিউটেশনাল বিশ্লেষণে আরও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, মানুষের শরীরের তাপমাত্রায় এই টিকাটি কাঠামোগতভাবে স্থিতিশীল থাকে এবং এর থেকে বিষাক্ত বা অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া হওয়ার ঝুঁকি কম। তবে গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এই ফলাফল এখনো কেবল কম্পিউটারভিত্তিক গবেষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ। চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য বিবেচিত হওয়ার আগে এ টিকাকে পরীক্ষাগারে যাচাই, প্রাণীর ওপর পরীক্ষা এবং মানবদেহে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মধ্য দিয়ে যেতে হবে, যাতে এর নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা যায়।

প্রেসটিভি লিখেছে, এই গবেষণাটি পরবর্তী প্রজন্মের ক্যান্সারের টিকা তৈরির জন্য একটি আশাব্যঞ্জক রূপরেখা তৈরি করেছে। পাশাপাশি, সুনির্দিষ্ট ক্যান্সার ইমিউনোথেরাপি তৈরির ক্ষেত্রে কম্পিউটেশনাল ডিজাইন কীভাবে সময় এবং ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে, তাও তুলে ধরেছে।

তথ্য সূত্র- প্রেসটিভি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights