স্বাক্ষর জাল ও রেজুলেশনে গরমিল, একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পরও ব্যবস্থা নেই

আব্দুস সালাম, দিনাজপুর প্রতিনিধি ঃ
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, নিয়োগকর্তাদের স্বাক্ষর জালিয়াতি,
রেজুলেশনে গরমিল ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ—সব মিলিয়ে প্রশ্নের
মুখে পড়েছে দিনাজপুর শহীদ কর্নেল কুদরত ইলাহী পাবলিক স্কুলের প্রধান
শিক্ষক মাসুমা বেগমের নিয়োগ।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে একাধিক জাতীয় দৈনিকসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে
আগেও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই-বাছাই এবং তদন্তে বেশ কিছু অসংগতির তথ্য
পাওয়ার কথাও জানিয়েছে বিদ্যালয় পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ। অদৃশ্য শক্তির
ইশারায় কার্যত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছে না কর্তৃপক্ষ।
এরপরও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কার্যকর
ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে।
তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক
পৃষ্ঠপোষকতার সুযোগ নিয়ে নিয়োগসহ বিভিন্ন সুবিধা পেয়েছেন
মাসুমা বেগম। সরকার পরিবর্তনের পরও তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের
বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা না হওয়ায় সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি
হয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি জাতীয় ও স্থানীয়
একটি পত্রিকায় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা
হয়। বিজ্ঞপ্তিতে ১৫ দিনের মধ্যে আবেদন করতে বলা হয়েছিল। মাসুমা বেগম
বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। পরে
তিনি নিজেই প্রধান শিক্ষক পদে আবেদন করেন।
অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর দিক হলো—প্রধান শিক্ষক পদে প্রার্থী হওয়ার
পাশাপাশি তিনি নিয়োগ প্রক্রিয়ার সদস্য সচিবের দায়িত্বও পালন করেন।
ফলে নিজের আবেদনপত্রসহ আরও দুই প্রার্থীর কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে
নিজেই বৈধ প্রার্থী হিসেবে ঘোষনা করেন।

মাসুমা বেগমের নিয়োগকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দেখাতে বিদ্যালয়ের
একজন সহকারী মৌলভী শিক্ষক জহুরুল ইসলাম এবং ক্যামব্রিজ কিন্ডার
গার্ডেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক রহমত আল মাসুদ কে প্রধান শিক্ষক পদে
প্রার্থী করা হলেও প্রধান শিক্ষক পদের ন্যূনতম যোগ্যতা ছিল না। তাদের
কাগজপত্র যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করাও হয়নি। ওই দুই প্রার্থীকে
‘প্রক্সি প্রার্থী’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
নিয়োগসংক্রান্ত বিভিন্ন নথিতে বিদ্যালয়ের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত প্রধান
শিক্ষক শহিদুল ইসলামের স্বাক্ষর নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শহিদুল ইসলাম
স্পষ্টভাবে দাবি করেছেন, প্রধান শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার উত্তরপত্র বা
মূল্যায়নপত্রে তিনি কোনো স্বাক্ষর করেননি। তাঁর স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে।
২০১৮ সালের ২১ মার্চ সহকারী শিক্ষক শহিদুল ইসলাম কে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত
প্রধান শিক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠানের রেজুলেশনপত্রে দেখানো হলেও তাকে
বিদ্যালয়ের কোন দায়িত্ব পালন করতে দেওয়া হয়নি। গত ৪ এপ্রিল ২০১৮
তারিখে অনুষ্ঠেয় প্রধান শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার উত্তরপত্রে ভারপ্রাপ্ত প্রধান
শিক্ষক শহিদুল ইসলাম ও তৎকালীন সভাপতি মাহবুব মোর্শেদ এর স্বাক্ষর
জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে প্রধান শিক্ষক মাসুমা বেগম বলেন, বিদ্যালয়টি বর্ডার
গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)র মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ বিষয়টি
তদন্ত করে যে সিদ্ধান্ত দেবে, তিনি তা মেনে নেবেন।
বিদ্যালয়ের সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শহিদুল ইসলাম বলেন, বিজিবির
পক্ষ থেকে তাকে এ বিষয়ে ডাকা হয়েছিল। প্রধান শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার
উত্তরপত্র বা মূল্যায়নপত্রে তিনি কোনো স্বাক্ষর করেননি। তাঁর স্বাক্ষর জাল করা
হয়েছে বলে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন।
তৎকালীন প্রধান শিক্ষক প্রার্থী (প্রক্সি) ও বর্তমান মৌলবি শিক্ষক জহুরুল
ইসলাম সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, প্রধান শিক্ষক পদে
লিখিতভাবে তিনি কোন আবেদন করেননি এবং বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী প্রধান
শিক্ষক পদে তার কোন যোগ্যতা ছিল না। নিয়োগ পরীক্ষার দিন অন্য একটি
কাজের কথা বলে তাকে ডেকে নেওয়া হয়। এবং নিয়োগ পরীক্ষায় উপস্থিত
দেখানো হয়েছে মাত্র।
বিদ্যালয়টির কার্যনির্বাহী পরিষদের সভাপতি ও দিনাজপুর ৪২ বিজিবির
অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্দুল্লাহ আল মঈনের নিকট প্রধান শিক্ষক
মাসুমা বেগমের বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতি ও নিয়োগ জালিয়াতির
বিষয়ে তথ্য প্রমান উপস্থাপন করা হলে, প্রধান শিক্ষকের নিয়োগ জালিয়াতির
ও অনিয়মের বিষয়ে একমত প্রকাশ করে তিনি বলেন, বিজিবির প্রাথমিক

তদন্তে নিয়োগ জালিয়াতির সত্যতা পাওয়া গিয়েছে। এই মর্মে তার
বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
দিনাজপুর দুর্নীতি দমন কমিশন উপ-পরিচালক আতাউর রহমান সরকার বলেন,
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে তারা বিষয়টি সম্পর্কে
অবগত হয়েছেন। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, নিয়োগ প্রক্রিয়া ও স্বাক্ষর
জালিয়াতিসহ কয়েকটি বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে।
বিষয়টি নিয়ে দ্রুত ইনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কমিশনারের
কাছে আবেদন করা হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে বিস্তারিত অনুসন্ধান
করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দিনাজপুর-২ (বিরল-বোচাগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য এবং গণশিক্ষা ও
প্রাথমিক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য আলহাজ সাদিক
রিয়াজ চৌধুরী পিনাক বলেন, পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে প্রধান শিক্ষক
নিয়োগসংক্রান্ত জালিয়াতির বিষয়টি জানতে পেরে বিদ্যালয়
কার্যনির্বাহী পরিষদের সভাপতি লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্দুল্লাহ আল মঈন
কে বিষয়টি তদন্তপূর্ব দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights