স্বাস্থ্যসেবায় নানান উদ্যোগ প্রাণঘাতী রোগের চ্যালেঞ্জ

জয়শ্রী ভাদুড়ী

সরকারের একগুচ্ছ নতুন পরিকল্পনায় বাড়ছে স্বাস্থ্যসেবার পরিসর। চিকিৎসাকে শুধু হাসপাতালকেন্দ্রিক না রেখে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা আরও শক্তিশালী করতে দেওয়া হচ্ছে বিশেষ গুরুত্ব। চলমান সংকট কমাতে স্বাস্থ্য খাতে এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে বিএনপি সরকারের ১৮০ দিনে নেওয়া সেবামুখী এই উদ্যোগগুলোকে চ্যালেঞ্জে ফেলছে হাম, ডেঙ্গুজ্বরের মতো প্রাণঘাতী রোগ।

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করে বিএনপি। স্বাস্থ্যকে মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতের লক্ষ্য নিয়ে বিএনপির ইশতেহারে স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে মন্ত্রিসভার সামনে ১৮০ দিনের লক্ষ্য অর্জনের চ্যালেঞ্জ ধরিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতেই ১৫ মার্চ থেকে ছড়িয়ে পড়ে হামের প্রকোপ। রাজধানীসহ সারা দেশের হাসপাতালে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত শিশুদের ভিড় বাড়তে থাকে। গতকাল পর্যন্ত পাঁচ মাসে হাম ও হামের উপসর্গে প্রাণ হারিয়েছে ৮৯০ জন শিশু। শিশু মৃত্যু ঠেকাতে সরকার তড়িঘড়ি টিকা ক্যাম্পেইন শুরু করলেও হাম নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগকে। হামের প্রকোপের মধ্যেই বাড়তে শুরু করেছে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রোগী। এডিস মশার কামড়ে এর মধ্যেই ঝরে গেছে ৬৫ জনের প্রাণ। আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২২ হাজার ২৪৩ জন। ১৮০ দিনে স্বাস্থ্য খাতের এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, হাম আক্রান্তদের বড় একটি অংশ টিকা নেয়নি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে এবং ইতোমধ্যে ১০ লাখের বেশি নতুন টিকা দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবাকে জনমুখী করতে উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোকে ৫০ বা ১০১ শয্যায় উন্নীত করার পরিবর্তে ১৫১ শয্যায় রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব হাসপাতালে ১০ শয্যার ডায়ালাইসিস সুবিধা, শিশুদের জন্য ২৫ শয্যার কেয়ার সেন্টার এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় আরও ১৫টি অতিরিক্ত শয্যা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী হাসপাতালের অবকাঠামোও সম্প্রসারণ করা হবে। জনবল সংকট মোকাবিলায় নতুন করে ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়া গেছে। পাশাপাশি আড়াই হাজার টেকনিশিয়ান ও আড়াই হাজার নার্স নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’ ৯৩০টি ডায়ালাইসিস মেশিন পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবলের অনুমোদনও পাওয়া গেছে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি আরও বলেন, ‘বিভিন্ন হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে ক্যাথল্যাব, ডায়ালাইসিস মেশিন, আইসিইউ বেড, এমআরআই, এক্সরে ও আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন থাকলেও জনবলের অভাবে সেগুলো ব্যবহার না হওয়ার বিষয়টি নজরে এসেছে। সচল যন্ত্রপাতি প্রয়োজনীয় টেকনিশিয়ান নিয়োগ দিয়ে চালু এবং মেরামতযোগ্য সরঞ্জাম মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’ গত ছয় মাসে সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হঠাৎ পরিদর্শনে গিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বিভিন্ন অনিয়ম, অব্যবস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছেন বলেও জানান।

১৮০ দিনে স্বাস্থ্য খাতের এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিষয়ে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘দুর্নীতি প্রতিরোধের লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি এবং আশা করছি সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এই পাঁচ বছরের মেয়াদের মধ্যেই নির্ধারিত লক্ষ্য বাস্তবায়ন করব। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অতীতে অনেক দুর্নীতির অভিযোগ এবং কেনাকাটা নিয়ে অনিয়ম ছিল। আমরা একটি দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য বদ্ধপরিকর এবং বিশ্বাস করি এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারব।

চিকিৎসকদের উপস্থিতি ও ডিজিটাল মনিটরিং : স্বাস্থ্যসেবায় শৃঙ্খলা ফেরাতে আমরা চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে কাজ করছি। এজন্য ডিজিটাল হাজিরা এবং ফেস রিকগনিশন (প্রবেশ ও বাহির) ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এ ছাড়া ‘জিও ফ্যান্সিং’ এবং ‘ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড’ স্থাপনের পরিকল্পনা আছে যাতে রিয়েল টাইম দেখা যায় কোন চিকিৎসক কোথায় কাজ করছেন। বিভাগীয় পরিচালক, সিভিল সার্জন এবং হাসপাতালের পরিচালকদের আমরা উৎসাহিত করছি এবং জুমে আলোচনার মাধ্যমে তদারকি জোরদার করা হচ্ছে।

জনবল নিয়োগ ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা : আমরা দ্রুত ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের কাজ শুরু করব। বর্তমানে অনুমোদিত শূন্য পদ (প্রায় ১৫ হাজার ৮০০ এর বেশি) পূরণের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সরকারের অগ্রাধিকার হলো প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা। ইউনিয়ন হেলথ কমপ্লেক্সগুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন (সংস্কার বা সম্প্রসারণ) করা হবে।

প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা : নিয়োগকরা ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মীর মধ্যে ৮০% হবেন নারী। যারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা দেবেন। আমাদের মূল লক্ষ্য রোগ প্রতিরোধ করা। আমরা হিসাব করে দেখেছি, এই মডেলে কাউন্সিলিং ও সচেতনতা বাড়াতে পারলে হাসপাতালের ওপর চাপ প্রায় ৪০% কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

সেবা কেন্দ্রগুলোর সমন্বয় : ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণকেন্দ্র, ইউনিয়ন সাব-সেন্টার এবং কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর মধ্যে সমন্বয় করা হবে। জনবল ঘাটতি পূরণের মাধ্যমেই এই সমন্বয় সম্ভব। মূল ইউনিয়ন কেন্দ্রের সঙ্গে ওয়ার্ড পর্যায়ের সংযোগ স্থাপন করা হবে। স্বাস্থ্যকর্মীদের সরঞ্জাম ও নগরের স্বাস্থ্যসেবা : নারী স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য একটি ‘প্রাইমারি হেলথ বক্স’ এবং সাইকেল দেওয়ার পরিকল্পনা চলছে (যা এখনো চূড়ান্ত হয়নি), যাতে তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে রক্তচাপ বা সিবিসির মতো প্রাথমিক পরীক্ষাগুলো করতে পারেন। গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি আরবান (নগর) প্রাইমারি হেলথকেয়ারকেও শক্তিশালী করা হচ্ছে।

চিকিৎসক নিয়োগ : জনবল সংকট কাটাতে আমরা প্রায় ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছি। ইতোমধ্যে পিএসসির মাধ্যমে নিয়োগ কার্যক্রম চলছে। যার মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে ঘাটতি পূরণ করা হবে। এ ছাড়া চীনের বিনিয়োগে হাসপাতাল তৈরির বিষয়েও আলোচনা হচ্ছে।

বিএনপির ইশতেহারে ছিল যেসব প্রতিশ্রুতি : স্বাস্থ্য ব্যয় কমানো, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালীকরণ, নতুন করে স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে দলটির। চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে যাতে কোনো পরিবার সর্বস্বান্ত না হয়, সে লক্ষ্যেও বিভিন্ন আর্থিক সহায়তার প্রস্তাব রাখা হয়। স্বাস্থ্যসেবার পরিসর বাড়াতে পর্যায়ক্রমে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়। প্রত্যেক নাগরিককে ইলেকট্রনিক হেলথ বা ই-হেলথ কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনার কথা বলা হয়। স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূল ভিত্তি হিসেবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে। জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য প্রতিটি জেলায় আধুনিক সেকেন্ডারি স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে। দেশজুড়ে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রায় ১ লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় এনে দুর্নীতি প্রতিরোধের অঙ্গীকার করা হয়। প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে গ্রামে গ্রামে সংক্রামক রোগ, ডায়রিয়া, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও অপুষ্টি শনাক্তকরণ এবং রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। প্রাণঘাতী রোগের চিকিৎসায় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির বিষয়ে বলা হয়েছে।

বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ওষুধ, স্বল্পমূল্যে ক্যানসারসহ প্রাণঘাতী রোগের ওষুধ এবং বিনামূল্যে দেশি ভ্যাকসিন সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। মশাবাহিত রোগ নির্মূল, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও পুষ্টি সচেতনতা বাড়ানো, নিরাপদ পানি সরবরাহ, জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স পুল ও জরুরি চিকিৎসাসেবা, স্বাস্থ্য খাতে অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংযোজনের পরিকল্পনা রয়েছে। জাতীয় অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল গঠন, মেডিকেল শিক্ষায় গুরুত্ব, স্বাস্থ্যকর্মীদের মর্যাদা ও ক্যারিয়ার উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তার কথাও বলা হয়। এ ছাড়া নিরাপদ মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সমন্বিত জাতীয় পুষ্টি কর্মসূচি, তামাকজনিত অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে ইশতেহারে তুলে ধরা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights