হরমুজ অচল, পানামায় ভিড়: বিশ্ব তেলের নতুন নিরাপদ ঠিকানা কি যুক্তরাষ্ট্র?
অনলাইন ডেস্ক
ইরান সংকটের প্রভাবে বৈশ্বিক তেলবাজারে স্পষ্ট এক নতুন ভারসাম্য তৈরি হচ্ছে। হরমুজ প্রণালিতে ইরানি বাহিনীর বাধার কারণে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহকারী এই জলপথ কার্যত অনির্ভরযোগ্য হয়ে উঠেছে। এর ফলেই এশিয়ার শোধনাগারগুলো দ্রুত মার্কিন গালফ কোস্টের অপরিশোধিত তেলের দিকে ঝুঁকছে।
সমুদ্র পরিবহন–বিষয়ক সংস্থা কেপলার জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের ঘাটতি সামাল দিতে এশীয় ক্রেতারা যুক্তরাষ্ট্রের তেল কিনে তা হরমুজ এড়িয়ে পানামা খাল দিয়ে এশিয়ায় পাঠাচ্ছে। এপ্রিলের প্রথমার্ধে পানামা খাল দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তেল রপ্তানি দৈনিক ২ লাখ ব্যারেলের বেশি হয়েছে—২০২২ সালের জুলাইয়ের পর যা সর্বোচ্চ। তবে ৮২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সংকীর্ণ জলপথে ট্যাংকারগুলোর দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে; একটি ট্যাংকার পার হতে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগছে।
দ্রুত পারাপারের জন্য শিপিং কোম্পানিগুলো বাড়তি অর্থ দিতে রাজি হচ্ছে। ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, একটি এলপিজি ট্যাংকার পার করতে ৪ মিলিয়ন ডলার, আর অন্যরা ৩ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত দিয়েছে। এসব খরচ পানামা খাল কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত উচ্চ ট্রানজিট ফি–এর বাইরের ব্যয়।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট তেল আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্টের চেয়ে ব্যারেলপ্রতি ৩–৪ ডলার বেশি দামে লেনদেন হচ্ছে। ইরান যুদ্ধের সময় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কায় ব্রেন্টের দাম মার্চে ১১৩ ডলারে পৌঁছায়, যা ২০২২ সালের জুনের পর সর্বোচ্চ।
যুক্তরাষ্ট্র এখান থেকে লাভবান হচ্ছে। দেশটি বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদক—২০২৫ সালে দৈনিক উৎপাদন ১৩.৫ মিলিয়ন ব্যারেলের বেশি, যা বৈশ্বিক উৎপাদনের প্রায় ১৬ শতাংশ। গালফ কোস্টের শোধনাগারগুলো দিনে ১৮ মিলিয়ন ব্যারেল রপ্তানিযোগ্য তেল প্রস্তুত করতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তেলের দাম বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রই বেশি আয় করে।
যুদ্ধের আগে হরমুজ দিয়ে বিশ্ব সমুদ্রপথে তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহন হতো যার বেশিরভাগই এশিয়ায় যেত। এখন বিকল্প হিসেবে সুয়েজ–লোহিত সাগর ও মালাক্কা প্রণালি ব্যবহৃত হলেও বাব আল–মানদাব প্রণালিতে হুতি ঝুঁকি নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। এভাবে পানামা খালও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ‘চোকপয়েন্টে’ পরিণত হচ্ছে।
এই বাস্তবতায় ভারত, চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো জ্বালানি–নির্ভর দেশগুলো মার্কিন তেলকে যুদ্ধের সম তুলনামূলক নিরাপদ বিকল্প হিসেবে দেখছে। তবে রপ্তানি বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ভেতর জ্বালানির দাম রেকর্ড উচ্চতায় উঠছে, যা নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে।
